সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (বার্ষিক পরীক্ষা) বর্জন করে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছেন। অপরদিকে শিক্ষকদের শোকজ করে বিদ্যালয়ে ফেরাতে চেষ্টা করছে সরকার। কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে পরীক্ষা না নিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার পর দাবি মেনে না নিলে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষকরা। ফলে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মুখোমুখি পরিস্থিতিতে রয়েছেন শিক্ষকরা। আর এই অবস্থার মধ্যে বছরের শেষ পরীক্ষা যেটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা।
জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পে-কমিশনের সুপারিশ লাগবে। সেটিও চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের অপেক্ষা করা দরকার ছিল।’
শিক্ষকদের শোকজ করা হয়েছে, এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, জানতে চাইলে মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘শুধু যে পরীক্ষা বর্জন করেছেন সহকারী শিক্ষকরা তাই নয়, প্রধান শিক্ষকদেরও লাঞ্ছিত করেছেন। আমরা কঠোর অবস্থানে যাবো।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি আদায়ে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকরা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন গত ৮ নভেম্বর। এই আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন শিক্ষকরা। পরদিন ৯ নভেম্বর থেকে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি সারা দেশে সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। আন্দোলনের তৃতীয় দিন (১০ নভেম্বর) সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড নির্ধারণের আশ্বাসে অবস্থান কর্মসূচি ও কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন শিক্ষকরা।
সরকারের এই আশ্বাসের পর নভেম্বরের শেষ নাগাদ সহকারী শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দেন শিক্ষকরা। গত ৩০ নভেম্বর থেকে সহকারী শিক্ষকরা দেশব্যাপী কর্মবিরতি শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (বার্ষিক পরীক্ষা) হওয়ার কথা ছিল ১ ডিসেম্বর। এই পরিস্থিতিতে সহকারী শিক্ষকরা তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন বর্জন করেন। তবে দেশের অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে, কিংবা প্রধান শিক্ষকরা নিজেরাই শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক মূল্যায়ন চালিয়ে নিতে থাকেন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়পরীক্ষা বর্জনের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চার শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আবুল কাসেম, মোহাম্মদ শামছুদ্দিন মাসুদ, খাইরুন নাহার লিপি এবং মু. মাহবুবুর রহমানকেও শোকজ করা হয়।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শিক্ষক নেতাদের শোকজ করা হয়েছে। নোয়াখালী জেলায় ২৩ ও ২৫ ব্যাচের সব শিক্ষককে শোকজ করেছেন স্থানীয় শিক্ষা অফিসার।’’
এই ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখাসহ সব বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন শিক্ষক নেতারা। একইসঙ্গে বুধবার (৩ ডিসেম্বর) দেশের প্রতিটি উপজেলা শিক্ষা অফিসের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশও করেন শিক্ষকরা।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি আদায়ে লাগাতার কর্মবিরতি চলছে গত ৩০ নভেম্বর থেকে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (বার্ষিক পরীক্ষা) বর্জন করেন সহকারী শিক্ষকরা।
অপরদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের কর্মবিরতি বন্ধ রেখে তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (বার্ষিক পরীক্ষা) নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদি তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন না নেওয়া হয়, তাহলে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে কিছু কিছু বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা নিলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে গত কয়েক দিন ধরে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আর শিক্ষকরা রশি টানাটানি করছেন, কিন্তু ক্ষতির মধ্যে পড়ছে শিশু শিক্ষার্থীরা। শিশুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদপুরের এক অভিভাবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিক্ষকরা আন্দোলন করতেই পারেন। কিন্তু শিশুদের পরীক্ষা বন্ধ রেখে, তাদের জিম্মি করে আন্দোলন করছেন কেন? এতে শিশু শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে, আমরা অভিভাবকরা রয়েছি টেনশনে।
মন্ত্রণালয় ও শিক্ষকদের মুখোমুখি এই অবস্থানের পরও আন্দোলন চলবে কিনা, জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় আন্দোলনে গেছেন শিক্ষকরা। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।’’
শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন বর্জন করা হয়েছে, তার কী হবে জানতে চাইলে মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বলেন, ‘‘আমরা সারা বছর লেখাপড়া করিয়েছি, মূল্যায়নও করেছি। দাবি বাস্তবায়ন করা হলে ডিসেম্বরে ছুটির মধ্যেই তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন করা সম্ভব। মাত্র আট দিন সময় লাগবে মূল্যায়নে। এতে শিক্ষার্থীদের কোনও ক্ষতি হবে না।’’
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আরেক আহ্বায়ক খায়রুন নাহার লিপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আন্দোলন চলবে। প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদও আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে। ঐক্য পরিষদ নেতা আনিচুর রহমান, শাহীনুর আল আমিন, শাহীনুর আক্তারসহ অন্য নেতারাও আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) বৈঠকে হয়েছে আমাদের।’’
আন্দোলনে আহত হয়ে এক শিক্ষকের মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতারা বলেন, ‘পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় আহত চাঁদপুরের মতলব (উত্তর) উপজেলার ৫ নম্বর ঝিনাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুতে শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এমনিতেই সরকার আশ্বাস দিয়ে দাবি বাস্তবায়ন করেনি। এরপর আহত শিক্ষকের মৃত্যু আমাদের মর্মাহত করেছে।’’
মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন প্রদানের দাবিসহ অন্য আরও দুটি দাবি, যথা- ১০ ও ১৬ বছর চাকরি শেষে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন এবং প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই দাবিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা বেতন-কমিশনের সভাপতির সঙ্গে উল্লিখিত দাবিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। এর আগে এ মন্ত্রণালয় থেকে গত ৭ আগস্ট ৩৬৪ সংখ্যক স্মারকে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়টি বিবেচনার জন্য জাতীয় বেতন কমিশনের সভাপতিকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের বিষয়টি পে-কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই অর্থ বিভাগ কর্তৃক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে গত ১০ নভেম্বর অর্থ বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করার পরেও দেখা যাচ্ছে—সহকারী শিক্ষকদের কয়েকটি সংগঠন চলমান বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ না করে বিভিন্নভাবে এই পরীক্ষা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছেন। কোথাও কোথাও পরীক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক শিক্ষকদের ওপর হামলা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মসূচি গ্রহণ সরকারি চাকরি আইন, আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি এবং ফৌজদারি আইনেও বিবেচ্য।
এই পরিস্থিতিতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অবিলম্বে কাজে যোগদান করে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রান্তিকের পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত বিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্নের জন্য নির্দেশনা দেওয়া যাচ্ছে। অন্যথায়, এ ধরনের শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চাকরি আইন, আচরণ বিধিমালা ও ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষকদের তিন দফা
১. সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান বেতন স্কেল ১৩তম গ্রেড থেকে দশম গ্রেডে উন্নীত করা।
২. শিক্ষকদের ১০ ও ১৬ বছরপূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়ে জটিলতার অবসান।
৩. সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি।
রিপোর্টারের নাম 
























