ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য

আমাদের চারপাশে যখন অন্যায় সংঘটিত হয়, তখন সেটিকে প্রতিরোধ করার মানসিকতা তৈরি হওয়া জরুরি। এই প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতা বা সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবতার পক্ষে মানুষের অবস্থান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে শুধু একটি ঘটনার প্রতি উদাসীন থাকা নয়, বরং পরোক্ষভাবে সেই অন্যায়ের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করা। সভ্যতার ইতিহাসে যেসব মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, সেগুলোর পেছনে নিষ্ঠুর মানুষের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের নিষ্ক্রিয়তাও কম দায়ী ছিল না।

জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণযোগ্য: ‘এই পৃথিবী বসবাসের জন্য একটি বিপজ্জনক জায়গা; যারা খারাপ কাজ করে তাদের জন্য নয়, বরং যারা খারাপ কাজের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না তাদের জন্য’। অনেক সময় আমরা ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত না হলে বা বিপদ আমাদের দোরগোড়ায় না পৌঁছানো পর্যন্ত অন্যের কষ্ট, নিপীড়ন বা বঞ্চনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক অনুভূতিশূন্যতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা, সুবিধা ও স্বার্থের গণ্ডির বাইরে দেখতে শেখে না। ফলে সমাজের অন্য কারো ওপর নির্যাতন নেমে এলে সেটিকে নিজের সমস্যা বলে মনে করে না। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে নাগরিক চেতনাকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষকে এমন এক মানসিক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং নীরবতাই নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষ নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যখন একটি সমাজে মানুষ বারবার অন্যায় প্রত্যক্ষ করেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় না, তখন সেই সমাজে অন্যায় একটি ‘স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা’ হিসেবে জায়গা করে নেয়। ধর্ষণ, হত্যা, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, ঘুষ বা দুর্নীতির মতো অপরাধগুলো তখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং এগুলো ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। আর সেটাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভাষাতাত্ত্বিকভাবেও লক্ষ করা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো অনৈতিক আচরণ চলতে থাকলে মানুষ সেটিকে আর ‘অপরাধ’ মনে করে না, বরং ‘এটাই বাস্তবতা’, ‘এভাবেই চলে’, ‘এটাই নিয়ম’ কিংবা ‘কিছু করার নেই’—এ ধরনের অভিব্যক্তিতে তাকে বৈধতা দিতে শুরু করে। অর্থাৎ অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের অবক্ষয় সৃষ্টি করে, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন কায়েমের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

১৮ জেলায় বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরগুলোতে সতর্কবার্তা জারি

ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য

আপডেট সময় : ১০:৫৯:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

আমাদের চারপাশে যখন অন্যায় সংঘটিত হয়, তখন সেটিকে প্রতিরোধ করার মানসিকতা তৈরি হওয়া জরুরি। এই প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতা বা সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবতার পক্ষে মানুষের অবস্থান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে শুধু একটি ঘটনার প্রতি উদাসীন থাকা নয়, বরং পরোক্ষভাবে সেই অন্যায়ের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করা। সভ্যতার ইতিহাসে যেসব মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, সেগুলোর পেছনে নিষ্ঠুর মানুষের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের নিষ্ক্রিয়তাও কম দায়ী ছিল না।

জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণযোগ্য: ‘এই পৃথিবী বসবাসের জন্য একটি বিপজ্জনক জায়গা; যারা খারাপ কাজ করে তাদের জন্য নয়, বরং যারা খারাপ কাজের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না তাদের জন্য’। অনেক সময় আমরা ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত না হলে বা বিপদ আমাদের দোরগোড়ায় না পৌঁছানো পর্যন্ত অন্যের কষ্ট, নিপীড়ন বা বঞ্চনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক অনুভূতিশূন্যতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা, সুবিধা ও স্বার্থের গণ্ডির বাইরে দেখতে শেখে না। ফলে সমাজের অন্য কারো ওপর নির্যাতন নেমে এলে সেটিকে নিজের সমস্যা বলে মনে করে না। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে নাগরিক চেতনাকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষকে এমন এক মানসিক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং নীরবতাই নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষ নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যখন একটি সমাজে মানুষ বারবার অন্যায় প্রত্যক্ষ করেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় না, তখন সেই সমাজে অন্যায় একটি ‘স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা’ হিসেবে জায়গা করে নেয়। ধর্ষণ, হত্যা, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, ঘুষ বা দুর্নীতির মতো অপরাধগুলো তখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং এগুলো ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। আর সেটাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভাষাতাত্ত্বিকভাবেও লক্ষ করা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো অনৈতিক আচরণ চলতে থাকলে মানুষ সেটিকে আর ‘অপরাধ’ মনে করে না, বরং ‘এটাই বাস্তবতা’, ‘এভাবেই চলে’, ‘এটাই নিয়ম’ কিংবা ‘কিছু করার নেই’—এ ধরনের অভিব্যক্তিতে তাকে বৈধতা দিতে শুরু করে। অর্থাৎ অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের অবক্ষয় সৃষ্টি করে, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন কায়েমের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।