বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা যায়নি বললেই চলে। ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলেও, সেই সংসদও তিন বছরের মধ্যে কার্যকারিতা হারায়। এরপর গঠিত প্রতিটি সংসদই বিরোধী দলের বর্জন ও অনুপস্থিতির মধ্যে দিয়ে মেয়াদ পার করেছে। এমনকি শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে জেনারেল এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে গঠিত সংসদও বিরোধী দলবিহীন অবস্থায় চলেছে।
তবে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান সংসদকে ঘিরে মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সংসদ অধিবেশন চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ২১১টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, ৭৭ সদস্যের বিরোধী দল একেবারেই ছোট নয়। জনগণ এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে যে, বিরোধী দল সংসদে ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারছে কি না। কারণ, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দলই সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘হৃৎপিণ্ড’ স্বরূপ। বিরোধী দল দুর্বল হলে ক্ষমতাসীন দল ‘পরম ক্ষমতা’র অধিকারী হয়ে ওঠে, যা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে ধ্বংস করে দেয়।
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক: ‘ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর চরম ক্ষমতা মানুষকে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে’। সংসদে বিরোধী দল কোনো কারণে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং গণতন্ত্র কার্যত একদলীয় বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় রূপ নিতে শুরু করে।
কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক এবং কাম্যও বটে। তবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে কিছু জাতীয় ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য থাকা অপরিহার্য। সাধারণত, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য থাকে, যেমন—অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা না করা এবং ‘জনগণের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের’ মাধ্যমেই ক্ষমতার পরিবর্তন হবে—এই গণতান্ত্রিক দর্শনে উভয় পক্ষের বিশ্বাস রাখা। এ ছাড়া নির্বাচন কী পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং কীভাবে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ করা যাবে, সে বিষয়ে একটি স্থায়ী, সর্বসম্মত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।
রিপোর্টারের নাম 
























