দুই বছর আগেও যে কার্যালয়ে পুলিশি গ্রেপ্তার ও আটকের চরম ভয় উপেক্ষা করে শত শত নেতাকর্মীর উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত, রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির সেই কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন প্রায় জনশূন্য। কার্যালয়ের বহিরাগত দেয়ালগুলো নতুন রঙের উজ্জ্বলতায় পরিপাটি করা হলেও দলটির বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় দুই দশক পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করে। বর্তমানে ৫৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়ে গঠিত এই সরকার তাদের মেয়াদের পঞ্চম মাসে পদার্পণ করেছে। সংসদের বিরোধী দল যখন বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নামছে, তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি সম্পূর্ণভাবে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেছে। এর ফলে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে দলের শীর্ষনেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়ায় দলীয় কর্মকাণ্ডে এক ধরনের বড় অনুপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন যে সরকার গঠনের পর দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের प्रशासनिक সংস্কার ও ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে বেশি ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক তৎপরতা থেকে কিছুটা দূরে রয়েছেন। বিএনপির একটি বড় অংশ এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এখন মন্ত্রী এবং এমপি হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে যারা নিয়মিত নয়াপল্টনে আসতেন, তাদের অনেকেই এখন অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। তবে যুবদলের বর্তমান সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা নিয়মিত যাতায়াত রক্ষা করছেন। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় আগের মতো কার্যালয়ে সময় দিতে পারছেন না। দলের প্রবীণ নেতা ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যিনি বিগত ১৬ বছরের আন্দোলনে আবাসিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন কার্যালয়ে এসে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও মাঝে মাঝে এসে নেতাকর্মীদের সময় দিচ্ছেন। তবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর পর কেন্দ্রীয়ভাবে বড় কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।
কেন্দ্রীয় কার্যালয় ফাঁকা থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল তথা তৃণমূলে এক ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের ব্যানারে নতুন নতুন কার্যালয় খুলে বসেছেন। রাজধানী ঢাকার কবি নজরুল কলেজের পাশে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক কার্যালয়টি এখন সূত্রাপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দল আড্ডার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে তৃণমূলের এই তৎপরতার বিপরীতে সাংগঠনিক কাঠামোতে তীব্র স্থবিরতা বিরাজ করছে। সারা দেশে বিএনপির ৮৩টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের মধ্যে ৮১টিতে কমিটি থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি আছে মাত্র ৪৫টিতে এবং বাকি ৩৬টি চলছে সাময়িক আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। সম্মেলনে মাধ্যমে মাত্র ২০টি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম উত্তর ও শেরপুর জেলায় কোনো কমিটিই নেই। এছাড়া উপজেলা, পৌরসভা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ বা তামাদি হয়ে গেছে। হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাম্মী আক্তার এবং মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম সাংগঠনিক সংকটের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কেবল রুটিন মাফিক কাজ করছেন।
তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী হতাশা ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে নির্বাচনের পর দলকে যেভাবে গতিশীল করার প্রয়োজন ছিল, তা করা সম্ভব হয়নি। নোয়াখালী জেলার সেনবাগ পৌরসভার সাবেক আহ্বায়ক আবদুল হান্নান লিটন জানান যে জামায়াতের মতো সুসংগঠিত বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মোকাবিলায় বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশল কী হবে, তা এখনো কেন্দ্র থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে সরকারের মন্ত্রী এবং দলের নীতিনির্ধারকরা এই স্থবিরতাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান যে দীর্ঘদিন পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে সরকার প্রথমেই মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচি এবং হাসপাতালগুলোকে একশ শয্যায় রূপান্তরের মতো জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে। ফলে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের অগ্রাধিকার দিতে গিয়েই দল গোছানোর কাজে কিছুটা দেরি হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন যে সরকার গঠনের sechs মাস পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরবর্তী অ্যাকশন বা রদবদল পরিকল্পনা সামনে আসতে পারে এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরপরই জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব এনে দলের এই সাংগঠনিক জড়তা পুরোপুরি দূর করা হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























