ঢাকা ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

দেশের পানি নিরাপত্তায় পদ্মা বাঁধ: কৌশলগত উদ্যোগ, ন্যায্য হিস্যার বিকল্প নয়

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পানি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে প্রস্তাবিত পদ্মা বাঁধ প্রকল্পটি বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে, যা দেশের জন্য বহুমুখী বিপর্যয় ডেকে এনেছে। চুক্তি সত্ত্বেও ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে বিভিন্ন পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতীর ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয় এবং অনেক নদী মরে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে, পদ্মা বাঁধকে দেশের ভেতরে পানি ধরে রাখা, মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, সেচব্যবস্থা উন্নত করা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা, নৌ চলাচল সহজ করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, নৌ চলাচলের লক এবং মাছ চলাচলের ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক নদী পুনরুদ্ধারমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বাংলাদেশের মূল যুক্তি হলো, উজানের দেশ যদি পানির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে, তবে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও নিজের ভূখণ্ডে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। পদ্মা বাঁধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বর্ষাকালে প্রবাহিত বিপুল পরিমাণ পানির একটি অংশ ধরে রাখা এবং শুকনো মৌসুমে তা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা। প্রকল্পপত্র অনুযায়ী, এই বাঁধ প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে এবং প্রায় ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দিতে সক্ষম হবে। খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের উজাননির্ভর দুর্বলতা কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। যদিও ফারাক্কা ভারতের হাতে পানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে, তবে ভাটিতে নির্মিত এই পদ্মা বাঁধ কোনোভাবেই বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকারের প্রতিস্থাপন নয়, বরং তা পানির সংকট নিরসনে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্ষমতার পাঁচ মাস: তৃণমূল ও কেন্দ্রে বিএনপির সাংগঠনিক জড়তা কাটাতে কাউন্সিলের অপেক্ষা

দেশের পানি নিরাপত্তায় পদ্মা বাঁধ: কৌশলগত উদ্যোগ, ন্যায্য হিস্যার বিকল্প নয়

আপডেট সময় : ০৯:৪৯:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পানি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে প্রস্তাবিত পদ্মা বাঁধ প্রকল্পটি বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে, যা দেশের জন্য বহুমুখী বিপর্যয় ডেকে এনেছে। চুক্তি সত্ত্বেও ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে বিভিন্ন পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতীর ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয় এবং অনেক নদী মরে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে, পদ্মা বাঁধকে দেশের ভেতরে পানি ধরে রাখা, মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, সেচব্যবস্থা উন্নত করা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা, নৌ চলাচল সহজ করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, নৌ চলাচলের লক এবং মাছ চলাচলের ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক নদী পুনরুদ্ধারমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বাংলাদেশের মূল যুক্তি হলো, উজানের দেশ যদি পানির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে, তবে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও নিজের ভূখণ্ডে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। পদ্মা বাঁধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বর্ষাকালে প্রবাহিত বিপুল পরিমাণ পানির একটি অংশ ধরে রাখা এবং শুকনো মৌসুমে তা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা। প্রকল্পপত্র অনুযায়ী, এই বাঁধ প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে এবং প্রায় ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দিতে সক্ষম হবে। খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের উজাননির্ভর দুর্বলতা কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। যদিও ফারাক্কা ভারতের হাতে পানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে, তবে ভাটিতে নির্মিত এই পদ্মা বাঁধ কোনোভাবেই বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকারের প্রতিস্থাপন নয়, বরং তা পানির সংকট নিরসনে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।