ঢাকা ০২:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘গ্রিন হেলথকেয়ার ফ্রেমওয়ার্ক’: সামিহার উদ্ভাবনী উদ্যোগ

ঘূর্ণিঝড়ের রাতে খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকে যখন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন তীব্র বাতাস আর বৃষ্টির দাপটের মাঝে স্বাস্থ্যকর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে ফ্রিজে সংরক্ষিত টিকাগুলো। দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা অত্যাবশ্যকীয় এসব টিকা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা এলাকার শত শত শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। এই চিরচেনা বাস্তবতাকে বদলাতে চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সামিহা বিনতে মোস্তফা। তাঁর উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘Green Healthcare Framework for Kamarkhola Union, Dacope, Khulna’ সম্প্রতি Youth for NDCs, YECAP ও UNDP-এর সহযোগিতায় পরিচালিত ‘Youth for NDCs Implementer Fellowship’-এর অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

সামিহার পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের সময়ও স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা। এর জন্য তিনি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় একটি সৌর হাইব্রিড সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে থাকবে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি ব্যাকআপ ও স্মার্ট ইনভার্টার। ফলে জাতীয় গ্রিড অচল হয়ে গেলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় থাকবে, যা টিকার কোল্ড চেইন সুরক্ষিত রাখা, জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল রাখতে সহায়ক হবে।

তবে তাঁর ভাবনা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। কামারখোলা ইউনিয়নের আরেকটি বড় সমস্যা চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ ও অন্যান্য বর্জ্য অনেক সময় খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ সমস্যার সমাধানে প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে সৌরশক্তিচালিত অটোক্লেভ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চিকিৎসা বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করা হবে, ফলে দূষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বহুলাংশে কমবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জিআইএস (GIS) ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির ব্যবহার। এর মাধ্যমে একটি বন্যা-সহনশীল মানচিত্র তৈরি করা হবে, যা সৌর প্যানেল স্থাপনের নিরাপদ স্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে যুক্ত করা হবে, যা স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সামিহা বিনতে মোস্তফার এই উদ্যোগ সরাসরি প্রায় চার হাজার মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা: সত্য ও মিথ্যার এক অসম লড়াইয়ের ইতিহাস

দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘গ্রিন হেলথকেয়ার ফ্রেমওয়ার্ক’: সামিহার উদ্ভাবনী উদ্যোগ

আপডেট সময় : ০১:৪২:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ঘূর্ণিঝড়ের রাতে খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকে যখন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন তীব্র বাতাস আর বৃষ্টির দাপটের মাঝে স্বাস্থ্যকর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে ফ্রিজে সংরক্ষিত টিকাগুলো। দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা অত্যাবশ্যকীয় এসব টিকা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা এলাকার শত শত শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। এই চিরচেনা বাস্তবতাকে বদলাতে চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সামিহা বিনতে মোস্তফা। তাঁর উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘Green Healthcare Framework for Kamarkhola Union, Dacope, Khulna’ সম্প্রতি Youth for NDCs, YECAP ও UNDP-এর সহযোগিতায় পরিচালিত ‘Youth for NDCs Implementer Fellowship’-এর অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

সামিহার পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের সময়ও স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা। এর জন্য তিনি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় একটি সৌর হাইব্রিড সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে থাকবে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি ব্যাকআপ ও স্মার্ট ইনভার্টার। ফলে জাতীয় গ্রিড অচল হয়ে গেলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় থাকবে, যা টিকার কোল্ড চেইন সুরক্ষিত রাখা, জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল রাখতে সহায়ক হবে।

তবে তাঁর ভাবনা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। কামারখোলা ইউনিয়নের আরেকটি বড় সমস্যা চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ ও অন্যান্য বর্জ্য অনেক সময় খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ সমস্যার সমাধানে প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে সৌরশক্তিচালিত অটোক্লেভ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে চিকিৎসা বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করা হবে, ফলে দূষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বহুলাংশে কমবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জিআইএস (GIS) ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির ব্যবহার। এর মাধ্যমে একটি বন্যা-সহনশীল মানচিত্র তৈরি করা হবে, যা সৌর প্যানেল স্থাপনের নিরাপদ স্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে যুক্ত করা হবে, যা স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সামিহা বিনতে মোস্তফার এই উদ্যোগ সরাসরি প্রায় চার হাজার মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা।