ঢাকা ০৩:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা: সত্য ও মিথ্যার এক অসম লড়াইয়ের ইতিহাস

মানবতার ইতিহাসে কিছু ঘটনা এমন গভীর প্রভাব ফেলে, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেয়। কারবালার শাহাদত তেমনই এক বিরল ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। ৬১ হিজরির মহররম মাসের দশম দিনে, যা আশুরা নামে পরিচিত, ফোরাত নদীর তীরে যা ঘটেছিল তা কেবল একটি যুদ্ধের বিবরণ ছিল না। এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার এক অসম লড়াইয়ের দলিল, যেখানে সংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্র একটি দল অসীম সাহস, দৃঢ় বিশ্বাস এবং নৈতিকতার শক্তিতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্যায়ের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র সাইয়িদুনা হোসাইন ইবনে আলি (রা.)।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে কিছু পেছনে তাকাতে হবে। মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদে বসেন। ইয়াজিদের চরিত্র ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে সমসাময়িক মুসলিম পণ্ডিত এবং সাহাবাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। তিনি হযরত হোসাইন (রা.)-এর কাছে আনুগত্যের শপথ চাইলেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) জানতেন যে, এই আনুগত্য কেবল একজন শাসকের প্রতি ব্যক্তিগত বশ্যতা নয়, বরং এটি অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া এবং সত্যকে বিসর্জন দেওয়ার নামান্তর হবে।

এই পরিস্থিতিতে কুফার জনগণ হযরত হোসাইন (রা.)-কে অসংখ্য চিঠি পাঠিয়েছিল। তারা তাকে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। হোসাইন (রা.) প্রথমে তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় পাঠালেন সেখানকার পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য। মুসলিম ইবনে আকিলের প্রতিবেদন ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক; হাজার হাজার কুফাবাসী তার হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এরপর যা ঘটল তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিশ্বাসঘাতকতার একটি দৃষ্টান্ত। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে কুফাবাসীর মনোভাব সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিলেন। ফলস্বরূপ, মুসলিম ইবনে আকিল একাকী হয়ে পড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করলেন।

এদিকে, হোসাইন (রা.) তখন মক্কা থেকে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। পথে যখন তিনি মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদতের খবর পেলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেন, যারা ফিরে যেতে চান তারা ফিরে যেতে পারেন। কারণ এটি আর নিরাপদ যাত্রা নয়, বরং এক কঠিন ও বিপদসংকুল পথ। অনেকেই ফিরে গেলেন, কিন্তু হোসাইন (রা.) থামলেন না। শুধু তার পরিবার এবং কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। এই এগিয়ে চলাটাই ছিল সেই মহান সিদ্ধান্ত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

কারবালার প্রান্তরে পৌঁছে হযরত হোসাইন (রা.)-এর ছোট দলটি ইয়াজিদ বাহিনীর বিশাল সংখ্যক সৈন্য দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ে। এই অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল হোসাইন (রা.)-কে ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করা। কিন্তু তিনি তার নীতি ও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাঁর সঙ্গীরা এবং পরিবারের সদস্যরা, এমনকি ছোট শিশুরাও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে। মহররমের দশম দিনে, আশুরার সেই ভয়াল দিনে, হযরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর সাথীরা একে একে শাহাদত বরণ করেন। এই ঘটনা শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক শোকাবহ অধ্যায়, যা সত্য, ন্যায় ও ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় বার্তা বহন করে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লেবানন থেকে ইসরাইলের শর্তহীন প্রত্যাহারের দাবি হিজবুল্লাহ মহাসচিবের

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা: সত্য ও মিথ্যার এক অসম লড়াইয়ের ইতিহাস

আপডেট সময় : ০১:৪৮:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

মানবতার ইতিহাসে কিছু ঘটনা এমন গভীর প্রভাব ফেলে, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেয়। কারবালার শাহাদত তেমনই এক বিরল ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। ৬১ হিজরির মহররম মাসের দশম দিনে, যা আশুরা নামে পরিচিত, ফোরাত নদীর তীরে যা ঘটেছিল তা কেবল একটি যুদ্ধের বিবরণ ছিল না। এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার এক অসম লড়াইয়ের দলিল, যেখানে সংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্র একটি দল অসীম সাহস, দৃঢ় বিশ্বাস এবং নৈতিকতার শক্তিতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্যায়ের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র সাইয়িদুনা হোসাইন ইবনে আলি (রা.)।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে কিছু পেছনে তাকাতে হবে। মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদে বসেন। ইয়াজিদের চরিত্র ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে সমসাময়িক মুসলিম পণ্ডিত এবং সাহাবাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। তিনি হযরত হোসাইন (রা.)-এর কাছে আনুগত্যের শপথ চাইলেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) জানতেন যে, এই আনুগত্য কেবল একজন শাসকের প্রতি ব্যক্তিগত বশ্যতা নয়, বরং এটি অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া এবং সত্যকে বিসর্জন দেওয়ার নামান্তর হবে।

এই পরিস্থিতিতে কুফার জনগণ হযরত হোসাইন (রা.)-কে অসংখ্য চিঠি পাঠিয়েছিল। তারা তাকে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। হোসাইন (রা.) প্রথমে তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় পাঠালেন সেখানকার পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য। মুসলিম ইবনে আকিলের প্রতিবেদন ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক; হাজার হাজার কুফাবাসী তার হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এরপর যা ঘটল তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিশ্বাসঘাতকতার একটি দৃষ্টান্ত। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে কুফাবাসীর মনোভাব সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে দিলেন। ফলস্বরূপ, মুসলিম ইবনে আকিল একাকী হয়ে পড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করলেন।

এদিকে, হোসাইন (রা.) তখন মক্কা থেকে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। পথে যখন তিনি মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদতের খবর পেলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেন, যারা ফিরে যেতে চান তারা ফিরে যেতে পারেন। কারণ এটি আর নিরাপদ যাত্রা নয়, বরং এক কঠিন ও বিপদসংকুল পথ। অনেকেই ফিরে গেলেন, কিন্তু হোসাইন (রা.) থামলেন না। শুধু তার পরিবার এবং কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। এই এগিয়ে চলাটাই ছিল সেই মহান সিদ্ধান্ত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

কারবালার প্রান্তরে পৌঁছে হযরত হোসাইন (রা.)-এর ছোট দলটি ইয়াজিদ বাহিনীর বিশাল সংখ্যক সৈন্য দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়ে। এই অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল হোসাইন (রা.)-কে ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করা। কিন্তু তিনি তার নীতি ও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাঁর সঙ্গীরা এবং পরিবারের সদস্যরা, এমনকি ছোট শিশুরাও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে। মহররমের দশম দিনে, আশুরার সেই ভয়াল দিনে, হযরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর সাথীরা একে একে শাহাদত বরণ করেন। এই ঘটনা শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক শোকাবহ অধ্যায়, যা সত্য, ন্যায় ও ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় বার্তা বহন করে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।