ঢাকা ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

নিষেধাজ্ঞা বনাম নির্মাণ, কে জিতবে শেষ পর্যন্ত?

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির লড়াই নয়; এটি দুই ভিন্ন দর্শন ও কৌশলের সংঘর্ষ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার নীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে নীরবে নিজের প্রভাব বিস্তার করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন অবস্থান এই কৌশলকে আরও স্পষ্ট করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে, চীনের উত্থান ঠেকাতে হলে তার জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তি খাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগকে চাপে রাখতে হবে। তাই চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা এবং কৌশলগত অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। প্রকাশ্য সংঘাত বা উত্তেজনার বদলে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে। বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খল, বিরল খনিজ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগে চীন এমন অবস্থান তৈরি করেছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, তখন চীন আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবও তৈরি করেছে।

একই সঙ্গে চীন মার্কিন ডলারের বিকল্প আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি, সোনা মজুত, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ব্রিকস সম্প্রসারণ—সবকিছুই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কৌশলগত পার্থক্য স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। চীন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়। একটি কৌশল প্রতিরোধমূলক, অন্যটি নির্মাণমূলক।

ইতিহাস বলে, সামরিক শক্তি তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোই বৈশ্বিক নেতৃত্ব নির্ধারণ করে। তাই প্রশ্ন উঠছে, ২১ শতকের পরবর্তী দশকে বিশ্বের নেতৃত্ব কি এখনও ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে বেইজিং সেই অবস্থান দখল করবে?

উত্তর এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বন্দর, নিষেধাজ্ঞার চেয়ে সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক সংযোগ হয়তো আরও বড় ভূমিকা রাখতে চলেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরাকে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ইরানের নতুন গোপন সেল গঠন

নিষেধাজ্ঞা বনাম নির্মাণ, কে জিতবে শেষ পর্যন্ত?

আপডেট সময় : ০১:০৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির লড়াই নয়; এটি দুই ভিন্ন দর্শন ও কৌশলের সংঘর্ষ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার নীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে নীরবে নিজের প্রভাব বিস্তার করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন অবস্থান এই কৌশলকে আরও স্পষ্ট করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে, চীনের উত্থান ঠেকাতে হলে তার জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তি খাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগকে চাপে রাখতে হবে। তাই চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা এবং কৌশলগত অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। প্রকাশ্য সংঘাত বা উত্তেজনার বদলে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে। বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খল, বিরল খনিজ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগে চীন এমন অবস্থান তৈরি করেছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, তখন চীন আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবও তৈরি করেছে।

একই সঙ্গে চীন মার্কিন ডলারের বিকল্প আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি, সোনা মজুত, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ব্রিকস সম্প্রসারণ—সবকিছুই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কৌশলগত পার্থক্য স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। চীন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়। একটি কৌশল প্রতিরোধমূলক, অন্যটি নির্মাণমূলক।

ইতিহাস বলে, সামরিক শক্তি তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোই বৈশ্বিক নেতৃত্ব নির্ধারণ করে। তাই প্রশ্ন উঠছে, ২১ শতকের পরবর্তী দশকে বিশ্বের নেতৃত্ব কি এখনও ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে বেইজিং সেই অবস্থান দখল করবে?

উত্তর এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বন্দর, নিষেধাজ্ঞার চেয়ে সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক সংযোগ হয়তো আরও বড় ভূমিকা রাখতে চলেছে।