ঢাকা ০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

জনগণের বাজেট, নাকি কাগুজে লক্ষ্য?

জাতীয় বাজেটকে সাধারণত আয়-ব্যয়, রাজস্ব, ঘাটতি, প্রবৃদ্ধি কিংবা মুদ্রাস্ফীতির হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চুক্তি। এই দলিলই নির্ধারণ করে রাষ্ট্র কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, কীভাবে সম্পদ বণ্টন করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কোন পথে এগোবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশে মুদ্রাস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি সাধারণ মানুষের জীবনকে বাস্তবে স্বস্তি দিতে পারবে?

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যেখানে মূল্যস্ফীতির হার শহরের তুলনায়ও বেশি।

অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি একটি সূচক হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সংকট। বাজারে গিয়ে আগের টাকায় কম পণ্য কেনা, চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে সংগ্রাম করা—এসবই মূল্যস্ফীতির সরাসরি প্রভাব। যখন আয় বৃদ্ধির চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়।

দারিদ্র্য পরিস্থিতিও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অগ্রগতিতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় বর্তমানে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্য কি একাই মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সক্ষম? গত এক দশকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সুযোগের অসম বণ্টন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বৈষম্য শুধু আয়ের পার্থক্যের বিষয় নয়। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সুযোগ এবং ক্ষমতার প্রবেশাধিকারও বৈষম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শহরের একটি সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুর সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের শিশুর সুযোগের পার্থক্যই এর বড় উদাহরণ। ফলে বাজেটের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এই কাঠামোগত বৈষম্য কমানোর সক্ষমতার ওপর।

তরুণদের কর্মসংস্থানও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় নতুন চাকরি সৃষ্টির গতি মন্থর হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।

সরকার সম্প্রতি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণ বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন এবং বড় প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে উন্নয়নের সাফল্য কেবল রাস্তা, সেতু বা ভবনের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং জীবনমানের উন্নতিই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্বও এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের কয়েক কোটি মানুষ যেকোনো অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক ধাক্কায় নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দয়া বা সহায়তা হিসেবে নয়, বরং নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের অবদান বৈশ্বিক উষ্ণায়নে প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, পুনর্বাসন এবং অভিযোজন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় জনআস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তখনই কর দিতে আগ্রহী হয়, যখন তারা বিশ্বাস করে রাষ্ট্র তাদের করের অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কাগজে-কলমের প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তার ওপর। নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ কতটা বিস্তৃত হয় এবং বৈষম্য কতটা কমে—এসবই হবে বাজেটের আসল মূল্যায়নের মানদণ্ড।

বাজেট শেষ পর্যন্ত শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের মানবিক ও সামাজিক দর্শনের প্রতিফলন। যদি এই বাজেট বৈষম্য কমাতে, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরাকে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ইরানের নতুন গোপন সেল গঠন

জনগণের বাজেট, নাকি কাগুজে লক্ষ্য?

আপডেট সময় : ১২:০১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

জাতীয় বাজেটকে সাধারণত আয়-ব্যয়, রাজস্ব, ঘাটতি, প্রবৃদ্ধি কিংবা মুদ্রাস্ফীতির হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চুক্তি। এই দলিলই নির্ধারণ করে রাষ্ট্র কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, কীভাবে সম্পদ বণ্টন করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কোন পথে এগোবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশে মুদ্রাস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি সাধারণ মানুষের জীবনকে বাস্তবে স্বস্তি দিতে পারবে?

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যেখানে মূল্যস্ফীতির হার শহরের তুলনায়ও বেশি।

অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি একটি সূচক হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সংকট। বাজারে গিয়ে আগের টাকায় কম পণ্য কেনা, চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে সংগ্রাম করা—এসবই মূল্যস্ফীতির সরাসরি প্রভাব। যখন আয় বৃদ্ধির চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়।

দারিদ্র্য পরিস্থিতিও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অগ্রগতিতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় বর্তমানে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্য কি একাই মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সক্ষম? গত এক দশকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সুযোগের অসম বণ্টন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বৈষম্য শুধু আয়ের পার্থক্যের বিষয় নয়। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সুযোগ এবং ক্ষমতার প্রবেশাধিকারও বৈষম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শহরের একটি সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুর সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের শিশুর সুযোগের পার্থক্যই এর বড় উদাহরণ। ফলে বাজেটের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এই কাঠামোগত বৈষম্য কমানোর সক্ষমতার ওপর।

তরুণদের কর্মসংস্থানও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় নতুন চাকরি সৃষ্টির গতি মন্থর হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।

সরকার সম্প্রতি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণ বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন এবং বড় প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে উন্নয়নের সাফল্য কেবল রাস্তা, সেতু বা ভবনের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং জীবনমানের উন্নতিই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্বও এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের কয়েক কোটি মানুষ যেকোনো অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক ধাক্কায় নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দয়া বা সহায়তা হিসেবে নয়, বরং নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের অবদান বৈশ্বিক উষ্ণায়নে প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, পুনর্বাসন এবং অভিযোজন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় জনআস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তখনই কর দিতে আগ্রহী হয়, যখন তারা বিশ্বাস করে রাষ্ট্র তাদের করের অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কাগজে-কলমের প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তার ওপর। নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ কতটা বিস্তৃত হয় এবং বৈষম্য কতটা কমে—এসবই হবে বাজেটের আসল মূল্যায়নের মানদণ্ড।

বাজেট শেষ পর্যন্ত শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের মানবিক ও সামাজিক দর্শনের প্রতিফলন। যদি এই বাজেট বৈষম্য কমাতে, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।