সুন্দরবনের কাছাকাছি কয়রায় নারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও নিজেরা বাড়ি ও কৃষি চর্চার ধরণ পরিবর্তন করেছেন। কোথাও বারান্দায় ঝুলছে বস্তাভরা সবজি, কোথাও উঠানে তৈরি করা হয়েছে টাওয়ার গার্ডেন, আবার কেউবা পুকুরের ওপর ভাসমান কাঠামোয় ছোট ছোট সবুজ বাগান গড়ে তুলেছেন।
কোয়ারার জেসমিন নাহারের বাড়িতে দুটি ঝুলন্ত প্লাস্টিকের বস্তায় জৈব সার মিশিয়ে পুঁইশাক চাষ করা হয়েছে। বাড়ির পাশে আরও বাঁশ ও চটা দিয়ে উঁচু কাঠামো বানিয়ে বেগুন, আদা, মিষ্টিকুমড়া ও লাউ চাষ করেছেন তিনি। জেসমিন জানান, বর্ষার সময় পানি জমে যায়, শুকনো মৌসুমে মাটিতে লবণ ওঠে, তাই বস্তায় উঁচু মাটিতে সবজি লাগাচ্ছেন। নিজেরা খাচ্ছেন, কিছু বিক্রি করতেও পারছেন।
পাশের বাড়ির মরিয়ম বেগমও বস্তায় মরিচ, ঢ্যাঁড়স ও লাউ চাষ করেছেন। মাচার পাশে ঝুলানো পুরোনো জুতা দিয়ে তিনি বলেন, ‘দুষ্টু মানুষের নজর লাগে গাছে, তাই জুতা ঝুলিয়েছি। আগে নিচু জমিতে ফলন ভালো হতো না, এখন ফলন ভালো হচ্ছে।’
উত্তর বেদকাশীর শারমিন সুলতানা ও শ্রাবণী বিশ্বাসও ছোট জায়গায় জলবায়ুসহিষ্ণু বাগান তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পরিবারের পুষ্টি ও আশপাশের মানুষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কিছু সবজি বিক্রি করছেন।
কোয়ারার বড়বাড়ি গ্রামের বীণা রায় বেসরকারি সংস্থার প্রশিক্ষণ অনুযায়ী বাঁশ, জাল ও বাতা দিয়ে চার-পাঁচ ফুট উঁচু গোল টাওয়ার বানিয়ে লাউ চাষ করছেন। বর্ষা ও শুকনো মৌসুমেও ফলন রক্ষা হয়। তিনি ইতিমধ্যে ৪৬টি লাউ বিক্রি করেছেন। তার স্বামী সুশান্ত রায়ও চাষে সহযোগিতা করছেন। ঘরের পেছনে বস্তা সাজিয়ে, পুকুরের মধ্যে খুঁটি পুঁতে নেট ঝুড়িতে ‘ডালি পদ্ধতি’ ব্যবহার করে সবজি চাষ করেছেন।
রত্নাঘেরীর এনামুল হক ও আনোয়ারা বেগমও বস্তা ও টাওয়ারে শসা, তরমুজ, লাউ, মরিচ, বেগুনসহ ১৩ রকম গাছ চাষ করছেন। আনোয়ারা বলেন, ‘নিচু লবণাক্ত মাটিতে কিছু হতো না, এখন বস্তার গাছ উঁচু রাখলে ফসল রক্ষা হয়।’ এনামুল যোগ করেন, আগে সবজি কিনে খেতেন, এখন নিজেরা উৎপাদিত সবজি খেতে পারছেন।
রত্নাঘেরীর বিউটি বেগমও টাওয়ারে বরবটির ফলন বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগে সবজি হতো না, এখন নতুন পদ্ধতিতে ফলন ভালো হচ্ছে।’
বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএসের গবেষণা সহযোগী মো. শাহ পরান জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক গভীর। কয়রার ৫০ জন নারীকে পিচার বা কলস পদ্ধতি, মালচিং, টাওয়ার ও বস্তায় চাষ, জৈব সার প্রস্তুতি ও হাত পরাগায়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সহজ ও টেকসই হওয়ায় স্থানীয়রা দ্রুত এগুলো গ্রহণ করছেন।
কোয়রা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আল মাহফুজ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি। এটি খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও টেকসই জীবনযাত্রা গঠনে সহায়তা করছে।
রিপোর্টারের নাম 

























