ঢাকা ০২:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনে নারী প্রার্থী: উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবীদের জয়জয়কার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭৮ জন। শতাংশের হিসেবে এটি মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশের কিছু কম। তবে সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে থাকলেও গুণগত মান ও যোগ্যতার দিক থেকে এবার নারী প্রার্থীরা বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের বড় একটি অংশই উচ্চশিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী।

উচ্চশিক্ষা ও পেশাদারিত্বের প্রাধান্য

নারী প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত ও হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৭৮ জনের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে ৬০ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পেশাগত দিক থেকেও তারা বেশ সফল; প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। ৫ শতাংশ মনোনয়ন কোটা পূরণ না হলেও যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে কণ্ঠশিল্পী ও উদ্যোক্তাও রয়েছেন।

নারী প্রার্থীদের পেশাগত বৈচিত্র্য:

  • ব্যবসায়ী: ১৬ জন
  • আইনজীবী: ১০ জন
  • টিউশনি/শিক্ষকতা: ৯ জন
  • চিকিৎসক: ৩ জন
  • ছাত্রী: ৫ জন
  • রাজনীতিবিদ: ৬ জন

বড় দলগুলোর অনীহা ও ‘জুলাই সনদ’

‘জাতীয় জুলাই সনদ ২০২৫’ অনুসারে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য অর্জনে ২৬টি দল এই সনদে সম্মতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা গেছে। বিএনপি ১০ জন নারীকে (৩.৪ শতাংশ) মনোনয়ন দিয়েছে এবং জামায়াতসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। ফলে ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনের ১০১ জন নারী প্রার্থীর তুলনায় এবার সংখ্যাটি কমে ৭৮-এ দাঁড়িয়েছে।

দলের নামনারী প্রার্থীর সংখ্যা
বিএনপি১০
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)
জাতীয় পার্টি (জাপা)
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
স্বতন্ত্র১৭

প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তরুণ ও প্রবীণ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে বড় ব্যবধান। সবচেয়ে কম বয়সী (২৫ বছর) প্রার্থী রয়েছেন ৩ জন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আখতার সুলতানা সবচেয়ে প্রবীণ, যার বয়স ৭৬ বছর ৮ মাস। প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সচ্ছল হিসেবে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খান রিতার নাম উঠে এসেছে, যার হলফনামা অনুযায়ী নগদ অর্থ রয়েছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একমাত্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে লড়ছেন মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী। তিনি রংপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি জানান, এবার নির্বাচনি পরিবেশ আগের চেয়ে ভালো হলেও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবন্ধকতা

নারী প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। ঢাকা-২০ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ জানান, ভোটাররা একজন যোগ্য নারী প্রার্থী পেয়ে গর্ববোধ করছেন। তবে বরিশাল-৫ আসনের মনীষা চক্রবর্ত্তী এবং ঢাকা-১২ আসনের তাসলিমা আখতারের মতো প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ প্রার্থীদের নারীবিদ্বেষী বক্তব্য এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতা তাদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছে।

শাসনপ্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, “নারী প্রার্থীরা যোগ্যতা ও দক্ষতায় অনেক এগিয়ে থাকলেও দলগুলো তাদের নেতৃত্ব বিকাশে আগ্রহী নয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

নির্বাচনে নারী প্রার্থী: উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবীদের জয়জয়কার

আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭৮ জন। শতাংশের হিসেবে এটি মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশের কিছু কম। তবে সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে থাকলেও গুণগত মান ও যোগ্যতার দিক থেকে এবার নারী প্রার্থীরা বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের বড় একটি অংশই উচ্চশিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী।

উচ্চশিক্ষা ও পেশাদারিত্বের প্রাধান্য

নারী প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত ও হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৭৮ জনের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে ৬০ জনই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পেশাগত দিক থেকেও তারা বেশ সফল; প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। ৫ শতাংশ মনোনয়ন কোটা পূরণ না হলেও যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে কণ্ঠশিল্পী ও উদ্যোক্তাও রয়েছেন।

নারী প্রার্থীদের পেশাগত বৈচিত্র্য:

  • ব্যবসায়ী: ১৬ জন
  • আইনজীবী: ১০ জন
  • টিউশনি/শিক্ষকতা: ৯ জন
  • চিকিৎসক: ৩ জন
  • ছাত্রী: ৫ জন
  • রাজনীতিবিদ: ৬ জন

বড় দলগুলোর অনীহা ও ‘জুলাই সনদ’

‘জাতীয় জুলাই সনদ ২০২৫’ অনুসারে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য অর্জনে ২৬টি দল এই সনদে সম্মতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা গেছে। বিএনপি ১০ জন নারীকে (৩.৪ শতাংশ) মনোনয়ন দিয়েছে এবং জামায়াতসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। ফলে ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনের ১০১ জন নারী প্রার্থীর তুলনায় এবার সংখ্যাটি কমে ৭৮-এ দাঁড়িয়েছে।

দলের নামনারী প্রার্থীর সংখ্যা
বিএনপি১০
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)
জাতীয় পার্টি (জাপা)
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
স্বতন্ত্র১৭

প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তরুণ ও প্রবীণ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে বড় ব্যবধান। সবচেয়ে কম বয়সী (২৫ বছর) প্রার্থী রয়েছেন ৩ জন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আখতার সুলতানা সবচেয়ে প্রবীণ, যার বয়স ৭৬ বছর ৮ মাস। প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সচ্ছল হিসেবে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খান রিতার নাম উঠে এসেছে, যার হলফনামা অনুযায়ী নগদ অর্থ রয়েছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একমাত্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে লড়ছেন মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী। তিনি রংপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি জানান, এবার নির্বাচনি পরিবেশ আগের চেয়ে ভালো হলেও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবন্ধকতা

নারী প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। ঢাকা-২০ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ জানান, ভোটাররা একজন যোগ্য নারী প্রার্থী পেয়ে গর্ববোধ করছেন। তবে বরিশাল-৫ আসনের মনীষা চক্রবর্ত্তী এবং ঢাকা-১২ আসনের তাসলিমা আখতারের মতো প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ প্রার্থীদের নারীবিদ্বেষী বক্তব্য এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতা তাদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছে।

শাসনপ্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, “নারী প্রার্থীরা যোগ্যতা ও দক্ষতায় অনেক এগিয়ে থাকলেও দলগুলো তাদের নেতৃত্ব বিকাশে আগ্রহী নয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।”