মানব সভ্যতার ইতিহাসে নৌপ্রযুক্তির বিকাশ এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। সমুদ্রপথের আবিষ্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার, সামরিক শক্তির বিস্তার এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নৌপ্রযুক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। যে জাতি সমুদ্রপথের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগীয় মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা নৌপ্রযুক্তির এমন এক শিখরে আরোহণ করেছিল, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তির বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের মুসলিম নাবিক, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রপথ নির্ধারণ, দিকনির্ণয় এবং মানচিত্রবিদ্যায় যে অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন, তা আজও বিস্ময়কর। তাদের উদ্ভাবিত বা উন্নতকৃত চৌম্বকীয় কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলেব এবং সামুদ্রিক মানচিত্র দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকে শুধু নিরাপদই করেনি, বরং অনেক বেশি কার্যকর করে তুলেছিল।
সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক শক্তিশালী সামুদ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিম নাবিকরা তাদের উন্নত নৌ-জ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয় পদ্ধতি এবং দক্ষ জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তির সাহায্যে পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, মালয় উপদ্বীপ এবং চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ইতিহাসবিদ জর্জ এফ. হাওরানি তার ‘Arab Seafaring in the Indian Ocean’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘আরব নাবিকরা উন্নত নৌদক্ষতা ও দিকনির্ণয় জ্ঞানের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।’
মুসলিম সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল উন্নত জাহাজ নির্মাণ শিল্প। আরবরা ‘ধাও’ (Dhow) নামক এক বিশেষ ধরনের পালতোলা জাহাজ নির্মাণ করেছিল, যা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এই জাহাজে ব্যবহৃত ত্রিভুজাকার ‘লাতিন পাল’ (Lateen Sail) জাহাজকে বাতাসের বিপরীত দিকেও চলতে সক্ষম করত, যা মুসলিম নাবিকদের দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে বিশেষভাবে সাহায্য করত। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় জাহাজ প্রযুক্তিতেও এই পাল ব্যবস্থার গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
রিপোর্টারের নাম 

























