সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটার এই সময়কে বলা হয় ‘দাওয়ামারি’। প্রথা অনুযায়ী, বৈশাখের এই ব্যস্ততায় হাওর কখনো ঘুমায় না। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে সেই চিরচেনা উৎসবের আমেজ উধাও হয়ে গেছে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সোনালি ধানের ক্ষেত এখন রূপালি জলের নিচে, আর কৃষকের চোখে বিরাজ করছে নিঃস্ব হওয়ার হাহাকার।
মাঠের চিত্র: পাকা ধানের বদলে পচা গন্ধ
দিরাই উপজেলার উদগল ও ছায়ার হাওরসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে এখন কেবলই পানি। গত ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে কয়েক লাখ হেক্টর জমির বোরো ফসল। উদগল হাওর পাড়ের কল্যাণী গ্রামের কৃষক অনিল চন্দ্র দাসের মতো বড় কৃষকরাও এবার দিশেহারা। ৬০ কিয়ার জমির মধ্যে তার ২০ কিয়ারই পানির নিচে। যা কেটেছেন, তার বড় অংশই পচে বিবর্ণ হয়ে গেছে। একই দশা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের। যেখানে বিঘায় বিঘায় ধানের ম-ম গন্ধ থাকার কথা, সেখানে এখন নাকে আসছে পচা ধানের গন্ধ।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রাপ্ত ভয়াবহ চিত্র:
- আবাদ ও লক্ষ্যমাত্রা: জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
- ডুবে যাওয়া জমি: সরকারি হিসেবেই ২০ হাজার ১২০ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, যদিও স্থানীয়দের দাবি এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক: প্রায় ৫০ হাজার ৯১৩টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ৫৭ হাজারেরও বেশি।
- বৃষ্টির তফাৎ: গত বছর এপ্রিলে বৃষ্টি হয়েছিল ১১০ মিলিমিটার, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২ মিলিমিটারে।
জীবন যুদ্ধের করুণ গল্প
কৃষক আলী নূর ও তার স্ত্রী সৈয়দা নূর সড়কের তপ্ত পিচে অঙ্কুর গজানো পচা ধান শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ধার-দেনা করে করা চাষাবাদ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের পরিবারে বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় আগামী এক বছর সংসার চালানো নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ছায়ার হাওরের কৃষক প্রাণেশ দাসের মতো বর্গাচাষিরা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব। তাদের একটাই প্রশ্ন— “কীভাবে চলবে পাঁচজনের সংসার?”
তথ্য নিয়ে বিতর্ক ও সরকারি পদক্ষেপ
কৃষি বিভাগের দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অধিকাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে; কিন্তু কৃষকদের দাবি— ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র গোপন করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল হাওর পরিদর্শন করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























