রাজধানীর এক সময়ের সুপরিচিত আবাসিক এলাকা মোহাম্মদপুর বর্তমানে অপরাধের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে এখন ‘ঢাকার বুকে অপরাধের আলাদা এক ভূখণ্ড’ হিসেবে পরিচিত। দিন-রাত নির্বিশেষে এখানে চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যকার রক্তাক্ত সংঘর্ষ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছে।
গত ১৫ এপ্রিল রাতে সাদেক খান ইটভাটার সামনে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুলকে কুপিয়ে হত্যা এবং তার মাত্র কয়েক দিন আগে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন ওরফে এলেক্স ইমনের হত্যাকাণ্ড এলাকাটিকে সহিংসতার স্থায়ী মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মাত্র ৩০০ মিটারের ব্যবধানে ঘটা এই দুটি হত্যাকাণ্ড পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি এলাকাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে গভীর আতঙ্ক। পুলিশ জানিয়েছে, আসাদুল মাদক ব্যবসার জেরে নিজ দলের সদস্যদের হাতে এবং ইমন আধিপত্য বিস্তারের জেরে প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঘনবসতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান এবং মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিনের মতে, এই এলাকাটি বিভিন্ন দিক থেকে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক হওয়ায় অপরাধীরা দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা উদ্যান সংলগ্ন তুরাগ নদীকে অপরাধীরা কেরানীগঞ্জ বা সাভারে যাতায়াতের রুট হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়া বসিলা, রায়েরবাজার এবং জেনেভা ক্যাম্পের মতো এলাকাগুলোতে ভাসমান ও প্রান্তিক মানুষের আধিক্য থাকায় অপরাধীদের আস্তানা গাড়া সহজ হয়। যদিও পুলিশের দাবি, তারা জনবল সংকট সত্ত্বেও নিয়মিত অভিযান ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অপরাধীদের ওপর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়া পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, এলাকাটিতে উর্দুভাষী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা যেমন সক্রিয় হচ্ছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিরাই অপরাধীদের আশ্রয়দাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় চালানো বিশেষ অভিযানে কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় তিনি এখন নিরপেক্ষ ও লক্ষ্যভিত্তিক বিশেষ অভিযানের ওপর জোর দিয়েছেন। মোহাম্মদপুরকে এই ‘অপরাধের রাজধানী’ তকমা থেকে মুক্ত করতে হলে প্রচলিত গুরুতর অপরাধগুলোকে জামিন অযোগ্য করা এবং অপরাধীদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 

























