দেশজুড়ে মাজারকেন্দ্রিক হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেলেও আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান বা সন্তোষজনক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গত ২০ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৬৭টি মাজারকেন্দ্রিক হামলার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়নি; বরং আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে কেবল সাধারণ ডায়েরি বা জিডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। দায়ের হওয়া মামলার একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং অত্যন্ত অল্প কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সংঘটিত দরবার প্রধান আব্দুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দেশের মাজারগুলোর নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর রূপটিকেই নতুন করে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে মাজারগুলোর ওপর হামলার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। এই সময়ে সারাদেশে মোট ৬৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার বিপরীতে পুলিশ মাত্র ৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণে দেখা যায়, এসব ঘটনায় সারাদেশে মাত্র ২৬টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৪০টি ক্ষেত্রে কেবল জিডি করা হয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি ঘটনায় কোনো নিয়মিত মামলা হয়নি। এর মধ্যে সিলেট ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা যেমন রয়েছে, তেমনি কুষ্টিয়ার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দরবার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের পর দরবার প্রধানকে হত্যার ঘটনায় ১৮০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হলেও প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহমেদ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাজারকেন্দ্রিক এই অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ছিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে। ঢাকা রেঞ্জে সর্বোচ্চ ২৫টি হামলা ও ৩৩ জন গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে হামলার সংখ্যা ১৫টি। তবে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কিছুটা তৎপরতা দেখা গেছে ময়মনসিংহ রেঞ্জে, যেখানে ৮টি ঘটনার বিপরীতে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী রেঞ্জে তিনটি হামলার ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। খুলনা, বরিশাল এবং সিলেট রেঞ্জের চিত্রও প্রায় একই রকম; যেখানে হামলার ঘটনা ঘটলেও গ্রেপ্তার বা মামলার সংখ্যা নগণ্য। তদন্তের হার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দায়ের করা ২৬টি নিয়মিত মামলার মধ্যে মাত্র ৯টিতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ১১টি মামলা ২০ মাস পার হওয়ার পরও তদন্তাধীন রয়েছে। অর্থাৎ ৪২ শতাংশেরও বেশি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ত্বরান্বিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, মাজারকেন্দ্রিক এসব হামলার পেছনে অনেক ক্ষেত্রে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সংকীর্ণ স্বার্থ কাজ করছে। অনেক গোষ্ঠী ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপপ্রয়োগ করে এই সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনার কোনো কার্যকর প্রতিকার বা বিচার না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এটি নতুন করে আরও বড় ধরনের সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। পুলিশের নিরপেক্ষতা এবং দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি অরাজকতার দিকে মোড় নিতে পারে, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বিরাট ঝুঁকি। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব এবং এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
রিপোর্টারের নাম 
























