বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ নয়, বরং ভূমধ্যসাগরের নোনাজলে ভেসে যাওয়া প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে অসংখ্য পরিবার। জীবন বাজি রেখে কেন আমাদের দেশের তরুণরা এমন মরণযাত্রায় শামিল হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরের লিবিয়া উপকূলে অভিবাসন প্রত্যাশীদের বহনকারী একটি উপচে পড়া রাবারের নৌকার ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যেখানে জার্মানির এনজিও সি-ওয়াচের উদ্ধারকারীদের তৎপরতা দেখা যায়। গড়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশের তরুণরা কেন এমন অনিশ্চিত ও ভয়ংকর পথে পা বাড়াচ্ছে, তা এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদিশা এরশাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র। গত বছর ওমরাহ পালনকালে মক্কার একটি হাইপারমার্কেটে নরসিংদীর দুই ভাই বুলবুল ও নাজিমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যাদের চেহারায় বয়সের চেয়েও বেশি ক্লান্তির ছাপ ছিল। তারা প্রায় পাঁচ বছর আগে দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। লিবিয়া হয়ে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে তাদের বহনকারী রাবারের নৌকায় থাকা ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই সলিলসমাধি লাভ করেন। ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া এই দুই ভাই আজ মক্কায় জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেই নৌকার অধিকাংশ মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। তাদের কোনো নাম নেই, কবর নেই, আছে শুধু পরিবারের অন্তহীন প্রতীক্ষা। ভূমধ্যসাগরের এই ট্র্যাজেডিগুলো এখন আর কেবল সংবাদ নয়, বরং এক ধরনের মানসিক অসাড়তা তৈরি করছে। প্রতিদিনের রাবারের নৌকা, উত্তাল ঢেউ আর ভাসমান লাশের সংখ্যাগুলো এখন মানুষের কাছে নিছক পরিসংখ্যানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যখন সুনামগঞ্জের কোনো এক নিভৃত গ্রামে একজন বৃদ্ধ বাবা তার সন্তানের অপেক্ষায় দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন, তখন বোঝা যায় এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি আমাদেরই জাতীয় শোকের গল্প।
সাম্প্রতিক সময়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি রাবারের নৌকায় ২২ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। বেঁচে ফেরা একজনের বর্ণনা অনুযায়ী, ছয় দিন ধরে কোনো খাবার, পানি বা জিপিএস ছাড়াই তারা সমুদ্রে ভাসছিলেন এবং যারা মারা যাচ্ছিলেন তাদের লাশ পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা এক নির্মম পুনরাবৃত্তি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ শতাংশই বাংলাদেশি। অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি এই একটি সাগরেই প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ৫৫৯ জন মারা গেছেন, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্র্যাকের হিসাব বলছে, প্রতি বছর এই রুটেই অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি প্রাণ হারান এবং ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার তালিকায় শীর্ষস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
তরুণদের এই আত্মঘাতী যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে দেশের তীব্র বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ যুক্ত হলেও কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। বাকি ৫৩ লাখ তরুণ বেকারত্বের ঘানি টানছেন এবং শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও যখন একজন তরুণ দেখেন যে সরকারি পদের বিপরীতে হাজারো প্রার্থী লড়ছেন এবং বেসরকারি খাতে কোনো নিশ্চয়তা নেই, তখন তিনি ১৫ লাখ টাকা দেশে বিনিয়োগ করার চেয়ে দালালের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশের সম্ভাবনার দরজায় কড়ানাড়া বেশি যৌক্তিক মনে করেন। গ্রামের কোনো একজন ইতালিতে গিয়ে স্বচ্ছল হওয়ার গল্পই এই তরুণদের প্রলুব্ধ করার জন্য যথেষ্ট হয়, আর দালালরা সেই প্রলোভনকেই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে পুঁজি করে।
দালালদের মুখে বিদেশ যাত্রার পথটি সহজ মনে হলেও লিবিয়া পৌঁছানোর পর শুরু হয় বিভীষিকা। সেখানে ‘গেইম ঘরে’ আটকে রেখে নির্যাতন, পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় এবং শেষ পর্যন্ত লাইফজ্যাকেট বা নেভিগেশন ছাড়াই ছোট রাবারের নৌকায় উত্তাল সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া হয়। এই পাচার চক্র দমনে হাজার হাজার মামলা ও অভিযান হলেও মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে মানবপাচার আইনে ৪ হাজার ৪৪৮টি মামলা বিচারাধীন এবং আসামি ১৬ হাজারের বেশি হলেও প্রভাবশালী গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার নজির খুব কম। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দালাল চক্রের যোগসাজশ এবং বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সাময়িক তৎপরতা এই সমস্যাকে আরও জিইয়ে রাখছে।
এই সংকটের দায় ইউরোপীয় দেশগুলোও এড়াতে পারে না। ইতালি, জার্মানি ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতে শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও বৈধ পথে কর্মী নিয়োগের সুযোগ কার্যত বন্ধ। যদি বৈধ চ্যানেল খোলা থাকত, তবে মানুষ কখনোই এমন ঝুঁকি নিত না। ২০১১ সালের পর লিবিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের জন্য এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে কেবল আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, বরং দেশের ভেতরে তরুণদের জন্য প্রকৃত কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর ও নরসিংদীর মতো এলাকাগুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি পাচার চক্রের উচ্চপর্যায়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সর্বোপরি, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক চুক্তি স্থাপন করা অপরিহার্য। প্রতিটি মৃত্যু কেবল একটি প্রাণের বিনাশ নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং একটি রাষ্ট্রের ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের প্রমাণ। এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে শোক প্রকাশের ঊর্ধ্বে গিয়ে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 























