ঢাকা ১০:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

তিস্তার চরাঞ্চলে তামাকের আগ্রাসন: জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের ওপর মারাত্মক হুমকি

লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন তামাক চাষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অধিক মুনাফার লোভে কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন, কিন্তু এই চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদীর পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এর ফলে তিস্তার মৎস্য সম্পদসহ জলজ প্রাণীর প্রজনন এবং নদীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানি কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করতে বীজ, সার, অগ্রিম ঋণ এবং বিক্রির নিশ্চয়তাসহ নানা সুবিধা প্রদান করছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এফসিভি, মতিহার, জাতি ও বার্লী—এই চার জাতের তামাকের চাষ হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কৃষকদের তামাক চাষে আগ্রহী করে তুলছে, যার ফলে লালমনিরহাটে তামাক চাষের পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে।

কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগেই কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শ—এসবই তামাক চাষ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। গত কয়েক বছরে লালমনিরহাটের যেসব জমিতে শীতকালীন মৌসুমে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুর মতো ফসল চাষ হতো, এখন সেসব জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

লালমনিরহাট সদরের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের আকবর আলী জানান, সিগারেট কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতি একর জমিতে তামাক চাষের জন্য বীজ বাবদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং সার বাবদ ৬ হাজার টাকার সার আগাম দিচ্ছেন। উৎপাদিত তামাক ন্যায্যমূল্যে কৃষকের বাড়ি থেকে কেনার নিশ্চয়তাও তারা পাচ্ছেন। এই কারণেই রবি মৌসুমে তামাকের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর এলাকার জেলে দবিয়ার রহমান বলেন, ‘তামাক চাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীতে প্রায় মাছই নেই। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না, আবার বর্ষাতেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।’

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, তিস্তার চরাঞ্চলে ঠিক কত জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, চরাঞ্চলের জমিগুলো অস্থায়ী হওয়ায় নিয়মিত জরিপ করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের তামাক চাষ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

তিস্তার চরাঞ্চলে তামাকের আগ্রাসন: জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের ওপর মারাত্মক হুমকি

আপডেট সময় : ১০:০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন তামাক চাষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অধিক মুনাফার লোভে কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন, কিন্তু এই চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদীর পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এর ফলে তিস্তার মৎস্য সম্পদসহ জলজ প্রাণীর প্রজনন এবং নদীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানি কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করতে বীজ, সার, অগ্রিম ঋণ এবং বিক্রির নিশ্চয়তাসহ নানা সুবিধা প্রদান করছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এফসিভি, মতিহার, জাতি ও বার্লী—এই চার জাতের তামাকের চাষ হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কৃষকদের তামাক চাষে আগ্রহী করে তুলছে, যার ফলে লালমনিরহাটে তামাক চাষের পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে।

কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগেই কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শ—এসবই তামাক চাষ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। গত কয়েক বছরে লালমনিরহাটের যেসব জমিতে শীতকালীন মৌসুমে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুর মতো ফসল চাষ হতো, এখন সেসব জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

লালমনিরহাট সদরের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের আকবর আলী জানান, সিগারেট কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতি একর জমিতে তামাক চাষের জন্য বীজ বাবদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং সার বাবদ ৬ হাজার টাকার সার আগাম দিচ্ছেন। উৎপাদিত তামাক ন্যায্যমূল্যে কৃষকের বাড়ি থেকে কেনার নিশ্চয়তাও তারা পাচ্ছেন। এই কারণেই রবি মৌসুমে তামাকের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর এলাকার জেলে দবিয়ার রহমান বলেন, ‘তামাক চাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীতে প্রায় মাছই নেই। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না, আবার বর্ষাতেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।’

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, তিস্তার চরাঞ্চলে ঠিক কত জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, চরাঞ্চলের জমিগুলো অস্থায়ী হওয়ায় নিয়মিত জরিপ করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের তামাক চাষ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না।