ঢাকা ০২:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

শিশুসাহিত্যের জাদুকর মোহাম্মদ নাসির আলী: এক কালজয়ী লেখকের জীবন ও কর্ম

বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা তাদের লেখার জাদুতে শিশুদের মনে এক বিশেষ স্থান করে নেন। এমনই একজন ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলী, যিনি ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার গেন্ডারিয়ায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও, তার সৃষ্ট গল্পগুলো আজও ছোটদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে এবং তাদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করছে।

মোহাম্মদ নাসির আলী শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব ভালোভাবে বুঝতেন। তিনি জানতেন, শিশুরা শুধু গল্প পড়তে নয়, জানতে, ভাবতে, রহস্য উন্মোচন করতে এবং প্রাণ খুলে হাসতেও ভালোবাসে। তাই তার গল্পে কখনো হাস্যরসের ফোয়ারা, কখনো সাহসী মানুষের কাহিনি, আবার কখনো দূর দেশের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের চিত্র ফুটে উঠেছে।

মোহাম্মদ নাসির আলী ৪১টি বই লিখেছেন, যার প্রতিটিই শিশু-কিশোরদের জন্য এক অনন্য উপহার। তার জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘লেবু মামার সপ্তকাণ্ড’, যা পড়লে মনে হয় এমন মজার একজন মানুষ যদি সত্যিই আমাদের আশেপাশে থাকতেন! ‘বোকা বকাই’ বইটিতে আছে মজার সব ঘটনা, আর ‘ভিনদেশি এক বীরবল’ শিশুদের বুদ্ধির খেলায় মেতে উঠতে উৎসাহিত করে। বিমান আবিষ্কারক দুই ভাই উইলবার রাইট ও অরভিল রাইটের দুঃসাহসিক আবিষ্কারের কথা নিয়ে লেখা ‘আকাশ যারা করল জয়’ বইটি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখায়। ইতালির স্বাধীনতা এনে দেওয়া বীর যোদ্ধা গ্যারিবল্ডির কাহিনি নিয়ে লেখা ‘ইতালির জনক গ্যারিবল্ডি’ এবং ‘ইবনে বতুতার সফরনামা’ পড়লে মনে হবে, পাঠকও যেন দূর দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘একটি গোয়েন্দা কুকুরের কাহিনি’ বইটি রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা, যেখানে এক কুকুরই হয়ে ওঠে গল্পের নায়ক।

মোহাম্মদ নাসির আলী কেবল গল্প লিখেই থেমে থাকেননি, তিনি শিশুদের জ্ঞানের জগৎ বড় করে তুলতে চেয়েছেন। ইতিহাসকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন এবং গল্পের মাধ্যমে দূর দেশের মানুষদের কাছে এনে দিয়েছেন। তার লেখার ভাষা সহজ, মিষ্টি ও প্রাণবন্ত, যা কঠিন শব্দে ভারাক্রান্ত না হয়ে পরিবারের একজন অভিভাবকের গল্প বলার মতো অনুভূতি দেয়। বই প্রকাশনাকে নিয়মিত রাখার জন্য তিনি ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার নামটি দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

শিশুসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য মোহাম্মদ নাসির আলী বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ইসলামি ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক লাভ করেন, যা তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি বহন করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে রাজনৈতিক পরিচয়মুক্ত রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

শিশুসাহিত্যের জাদুকর মোহাম্মদ নাসির আলী: এক কালজয়ী লেখকের জীবন ও কর্ম

আপডেট সময় : ০৪:০০:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা তাদের লেখার জাদুতে শিশুদের মনে এক বিশেষ স্থান করে নেন। এমনই একজন ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলী, যিনি ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার গেন্ডারিয়ায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও, তার সৃষ্ট গল্পগুলো আজও ছোটদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে এবং তাদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করছে।

মোহাম্মদ নাসির আলী শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব ভালোভাবে বুঝতেন। তিনি জানতেন, শিশুরা শুধু গল্প পড়তে নয়, জানতে, ভাবতে, রহস্য উন্মোচন করতে এবং প্রাণ খুলে হাসতেও ভালোবাসে। তাই তার গল্পে কখনো হাস্যরসের ফোয়ারা, কখনো সাহসী মানুষের কাহিনি, আবার কখনো দূর দেশের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের চিত্র ফুটে উঠেছে।

মোহাম্মদ নাসির আলী ৪১টি বই লিখেছেন, যার প্রতিটিই শিশু-কিশোরদের জন্য এক অনন্য উপহার। তার জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘লেবু মামার সপ্তকাণ্ড’, যা পড়লে মনে হয় এমন মজার একজন মানুষ যদি সত্যিই আমাদের আশেপাশে থাকতেন! ‘বোকা বকাই’ বইটিতে আছে মজার সব ঘটনা, আর ‘ভিনদেশি এক বীরবল’ শিশুদের বুদ্ধির খেলায় মেতে উঠতে উৎসাহিত করে। বিমান আবিষ্কারক দুই ভাই উইলবার রাইট ও অরভিল রাইটের দুঃসাহসিক আবিষ্কারের কথা নিয়ে লেখা ‘আকাশ যারা করল জয়’ বইটি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখায়। ইতালির স্বাধীনতা এনে দেওয়া বীর যোদ্ধা গ্যারিবল্ডির কাহিনি নিয়ে লেখা ‘ইতালির জনক গ্যারিবল্ডি’ এবং ‘ইবনে বতুতার সফরনামা’ পড়লে মনে হবে, পাঠকও যেন দূর দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘একটি গোয়েন্দা কুকুরের কাহিনি’ বইটি রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা, যেখানে এক কুকুরই হয়ে ওঠে গল্পের নায়ক।

মোহাম্মদ নাসির আলী কেবল গল্প লিখেই থেমে থাকেননি, তিনি শিশুদের জ্ঞানের জগৎ বড় করে তুলতে চেয়েছেন। ইতিহাসকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন এবং গল্পের মাধ্যমে দূর দেশের মানুষদের কাছে এনে দিয়েছেন। তার লেখার ভাষা সহজ, মিষ্টি ও প্রাণবন্ত, যা কঠিন শব্দে ভারাক্রান্ত না হয়ে পরিবারের একজন অভিভাবকের গল্প বলার মতো অনুভূতি দেয়। বই প্রকাশনাকে নিয়মিত রাখার জন্য তিনি ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার নামটি দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

শিশুসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য মোহাম্মদ নাসির আলী বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ইসলামি ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক লাভ করেন, যা তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি বহন করে।