ঢাকা ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ফররুখ আহমদ: ক্ষমতাবানদের প্রত্যাখ্যান এবং আত্মিক বৈভবের অন্বেষণ

“একজন কবির ক্ষমতাদর্পীর কাছ থেকে নেওয়ার কিছুই নেই।” এই উক্তিটি কেবল জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো প্রলাপ নয়, বরং মুখস্থ বা অভিমান থেকে বলা কথাও নয়। এটি হলো লোভনীয় নানা প্রাপ্তিকে প্রবল প্রতাপে প্রত্যাখ্যান করার এক অমোঘ ঘোষণা, চারপাশের অজস্র লালায়িত সত্তার সরব উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। কিন্তু কীসের বলে কবি ফররুখ আহমদ এমন ক্ষমতাধরদের তীব্র ভ্রুকুটি কোনো রূপ চিত্তচাঞ্চল্য ছাড়াই ছুড়ে ফেলতে পারেন? কেনই বা তিনি নির্দ্বিধায় জালিমকে জালিম বলতে পারেন, তা সে যতই শক্তিমান হোক না কেন? এবং কেনই বা তিনি তাদের নিবেদনকৃত যেকোনো অভিধা, উপঢৌকন অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করে যান, হোক তা ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ বা ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’-এর মতো সম্মাননা?

এই প্রশ্নগুলো, বিশেষ করে চারপাশের চাটুকার, মোসাহেব এবং পুরস্কার-ভিক্ষার এই যুগে, আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কবি ফররুখ আহমদের এই অতলান্ত রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে হলে আমাদের তাঁর সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে হবে। তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈভব কোন আলোর বিচ্ছুরণে উত্তাল এবং উত্তাপময়, তা অনুধাবন করতে হবে।

ফররুখ-সত্তার এই বিনির্মাণ এবং তাঁর প্রজ্বলিত বৈভব বোঝার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে ফলপ্রসূ মাধ্যম হলো তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’। যদিও ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’-এর কবিতাগুলোর রচনাকালেরই সমসাময়িক। প্রশ্ন হলো, ‘সিরাজাম মুনীরা’ কোন অর্থে ফররুখ-সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে?

এই কাব্যে কয়েকজন ইতিহাস-নির্মাতা ব্যক্তিবর্গের নাম শিরোনামে তুলে তিনি পঙ্‌ক্তি রচনা করেছেন। তবে কেবল সেইসব মহামানবদের জানলেই কি আমরা ফররুখকে জানতে পারব? অথবা সেইসব ব্যক্তির জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও সাধনা বুঝলেই কি ফররুখ-সত্তার বৈভব তৈরির মূল উপাদান বুঝে ফেলতে পারব? উত্তরটি হলো—না। ‘সিরাজাম মুনীরা’য় মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.), খিলাফাতে রাশিদার খলিফাগণ, শহীদে কারবালা, সুলতানুল হিন্দ, মুজাদ্দিদে আলফেসানি প্রমুখকে নিয়ে রচিত কবিতা সাজানো হয়েছে।

ফররুখকে কেউ কেউ ভুল বুঝেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ফররুখ আহমদ ইসলামের নবীকে নিয়ে ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতা লিখেছেন; লিখেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম চার সহচরকে নিয়ে—আবু বকর ছিদ্দিক, উমর দারাজ দিল, উসমান গণি এবং আলী হায়দর। যেহেতু ফররুখ তাঁদের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নিয়ে কবিতা লিখেছেন, তাই কেউ কেউ তাঁকে কেবল ‘ইসলামের কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আর যেহেতু তিনি ইসলামের জাগরণ চেয়েছেন, তাই তাঁকে ‘ইসলামি রেনেসাঁর’ প্রবক্তা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের শান্তি প্রস্তাবের জবাব প্রত্যাখ্যান করলেন ট্রাম্প, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে

ফররুখ আহমদ: ক্ষমতাবানদের প্রত্যাখ্যান এবং আত্মিক বৈভবের অন্বেষণ

আপডেট সময় : ০১:৫৪:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

“একজন কবির ক্ষমতাদর্পীর কাছ থেকে নেওয়ার কিছুই নেই।” এই উক্তিটি কেবল জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো প্রলাপ নয়, বরং মুখস্থ বা অভিমান থেকে বলা কথাও নয়। এটি হলো লোভনীয় নানা প্রাপ্তিকে প্রবল প্রতাপে প্রত্যাখ্যান করার এক অমোঘ ঘোষণা, চারপাশের অজস্র লালায়িত সত্তার সরব উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। কিন্তু কীসের বলে কবি ফররুখ আহমদ এমন ক্ষমতাধরদের তীব্র ভ্রুকুটি কোনো রূপ চিত্তচাঞ্চল্য ছাড়াই ছুড়ে ফেলতে পারেন? কেনই বা তিনি নির্দ্বিধায় জালিমকে জালিম বলতে পারেন, তা সে যতই শক্তিমান হোক না কেন? এবং কেনই বা তিনি তাদের নিবেদনকৃত যেকোনো অভিধা, উপঢৌকন অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করে যান, হোক তা ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ বা ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’-এর মতো সম্মাননা?

এই প্রশ্নগুলো, বিশেষ করে চারপাশের চাটুকার, মোসাহেব এবং পুরস্কার-ভিক্ষার এই যুগে, আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কবি ফররুখ আহমদের এই অতলান্ত রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে হলে আমাদের তাঁর সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে হবে। তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈভব কোন আলোর বিচ্ছুরণে উত্তাল এবং উত্তাপময়, তা অনুধাবন করতে হবে।

ফররুখ-সত্তার এই বিনির্মাণ এবং তাঁর প্রজ্বলিত বৈভব বোঝার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে ফলপ্রসূ মাধ্যম হলো তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’। যদিও ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’-এর কবিতাগুলোর রচনাকালেরই সমসাময়িক। প্রশ্ন হলো, ‘সিরাজাম মুনীরা’ কোন অর্থে ফররুখ-সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে?

এই কাব্যে কয়েকজন ইতিহাস-নির্মাতা ব্যক্তিবর্গের নাম শিরোনামে তুলে তিনি পঙ্‌ক্তি রচনা করেছেন। তবে কেবল সেইসব মহামানবদের জানলেই কি আমরা ফররুখকে জানতে পারব? অথবা সেইসব ব্যক্তির জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও সাধনা বুঝলেই কি ফররুখ-সত্তার বৈভব তৈরির মূল উপাদান বুঝে ফেলতে পারব? উত্তরটি হলো—না। ‘সিরাজাম মুনীরা’য় মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.), খিলাফাতে রাশিদার খলিফাগণ, শহীদে কারবালা, সুলতানুল হিন্দ, মুজাদ্দিদে আলফেসানি প্রমুখকে নিয়ে রচিত কবিতা সাজানো হয়েছে।

ফররুখকে কেউ কেউ ভুল বুঝেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ফররুখ আহমদ ইসলামের নবীকে নিয়ে ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতা লিখেছেন; লিখেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম চার সহচরকে নিয়ে—আবু বকর ছিদ্দিক, উমর দারাজ দিল, উসমান গণি এবং আলী হায়দর। যেহেতু ফররুখ তাঁদের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নিয়ে কবিতা লিখেছেন, তাই কেউ কেউ তাঁকে কেবল ‘ইসলামের কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আর যেহেতু তিনি ইসলামের জাগরণ চেয়েছেন, তাই তাঁকে ‘ইসলামি রেনেসাঁর’ প্রবক্তা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।