ঢাকা ০১:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সারের বৈশ্বিক সংকট: বাংলাদেশের পরিস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সার ও জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি খাতেও শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং আগামী এক বছর পর্যন্ত কোনো সংকটের কারণ নেই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন জেলায় ডিলারের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ কৃষকরা। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে প্রকৃত সংকটের চেয়েও ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির প্রবণতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টনের বেশি মজুত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম ইতিমধ্যে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে বেড়ে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

সারের মোট চাহিদার একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মূলত গ্যাস সাশ্রয় করতে সরকারের নেওয়া এই ‘রেশনিং’ সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মিসর ও রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির চেষ্টা চলছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে থাকায় বর্তমানে সারের চাহিদা কম, ফলে আপাতত বড় কোনো বিপর্যয় হবে না। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত ঘোড়াশালসহ অন্যান্য কারখানা চালু করার প্রক্রিয়া চলছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার সরবরাহ হয় যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, সেটি প্রায় এক মাস ধরে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম সতর্ক করেছেন যে, বিকল্প উৎস থেকে আমদানিতে দেরি করলে সারের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করবে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটা নিয়ে কৃষকদের অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সারের বৈশ্বিক সংকট: বাংলাদেশের পরিস্থিতি

আপডেট সময় : ১২:৪০:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সার ও জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি খাতেও শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং আগামী এক বছর পর্যন্ত কোনো সংকটের কারণ নেই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন জেলায় ডিলারের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ কৃষকরা। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে প্রকৃত সংকটের চেয়েও ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির প্রবণতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টনের বেশি মজুত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম ইতিমধ্যে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে বেড়ে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

সারের মোট চাহিদার একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে চারটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মূলত গ্যাস সাশ্রয় করতে সরকারের নেওয়া এই ‘রেশনিং’ সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মিসর ও রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির চেষ্টা চলছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে থাকায় বর্তমানে সারের চাহিদা কম, ফলে আপাতত বড় কোনো বিপর্যয় হবে না। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত ঘোড়াশালসহ অন্যান্য কারখানা চালু করার প্রক্রিয়া চলছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার সরবরাহ হয় যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, সেটি প্রায় এক মাস ধরে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম সতর্ক করেছেন যে, বিকল্প উৎস থেকে আমদানিতে দেরি করলে সারের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করবে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি।