ঢাকা ১২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

বিপিসির ২০৫ কোটি টাকার মোংলা জেটি: ৬ বছরেও ভেড়েনি কোনো জাহাজ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন’ এখন শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। নির্মাণের ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত বিপিসির এই জেটিতে আমদানি করা তেলের কোনো জাহাজ ভেড়েনি। ফলে একদিকে যেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অধিকাংশ তেলের ট্যাংকই পড়ে আছে ফাঁকা।


প্রকল্পের বর্তমান চিত্র ও অব্যবস্থাপনা

  • বিশাল বিনিয়োগ, শূন্য ব্যবহার: ২০১৪ সালে প্রকল্প হাতে নিয়ে ২০১৯ সালে ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন নির্মাণ শেষ করে বিপিসি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার পর এটিই ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি করা তেল খালাসের পয়েন্ট।
  • ফাঁকা তৈলাধার: এই ডিপোতে ১ লাখ টন জ্বালানি মজুত করার সুবিধা রয়েছে। ১৪টি ট্যাংকের মধ্যে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানিগুলো ভাগ করে ব্যবহার করলেও বছরের অধিকাংশ সময় ২০-২৫ শতাংশের বেশি ট্যাংক ব্যবহৃত হয় না।
  • যন্ত্রপাতির ক্ষয়: সচল জেটি সুবিধা ও সংযোজিত আধুনিক ফায়ার ফাইটিং এবং অপারেশনাল যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

কেন ভেড়েনি কোনো জাহাজ?

বিপিসির সাবেক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মতে, এই প্রকল্পের মূল বাধা হলো পশুর নদীর নাব্য সংকট
১. অপরিকল্পিত প্রকল্প: পশুর নদীতে গভীরতা কম থাকায় বড় কোনো তেলবাহী জাহাজ জেটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
২. ফিজিবিলিটি স্টাডির অভাব: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের মতে, প্রকল্পটি গ্রহণের আগে সঠিক ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। যদি হতো, তবে নদীর গভীরতা বিবেচনা না করে জেটি নির্মাণের মতো ঘটনা ঘটত না।
৩. ড্রেজিং সমস্যা: মোংলা বন্দরের পাশে হওয়ার সত্ত্বেও নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় জেটিটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে ডিজেল এনে নামমাত্র সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে।


জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের অনেক প্রকল্পই এমন অপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। যেখানে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মজুত বাড়ানোর কথা, সেখানে মোংলার মতো বড় ডিপোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারা চরম ব্যর্থতা। ছয় বছরে এক দিনের জন্যও জেটিটি ব্যবহার না হওয়া প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

বিপিসির সদ্য সাবেক পরিচালক ড. এ কে এম আজাদুর রহমানও স্বীকার করেছেন যে, গভীরতার সংকটের কারণেই মূলত জেটিটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুর নদীর ড্রেজিং নিশ্চিত করে জেটিটিকে সচল করা না গেলে এই বিশাল বিনিয়োগ পুরোপুরি বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করতে দিনাজপুরে প্রধানমন্ত্রী

বিপিসির ২০৫ কোটি টাকার মোংলা জেটি: ৬ বছরেও ভেড়েনি কোনো জাহাজ

আপডেট সময় : ১১:২২:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন’ এখন শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। নির্মাণের ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত বিপিসির এই জেটিতে আমদানি করা তেলের কোনো জাহাজ ভেড়েনি। ফলে একদিকে যেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অধিকাংশ তেলের ট্যাংকই পড়ে আছে ফাঁকা।


প্রকল্পের বর্তমান চিত্র ও অব্যবস্থাপনা

  • বিশাল বিনিয়োগ, শূন্য ব্যবহার: ২০১৪ সালে প্রকল্প হাতে নিয়ে ২০১৯ সালে ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন নির্মাণ শেষ করে বিপিসি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার পর এটিই ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি করা তেল খালাসের পয়েন্ট।
  • ফাঁকা তৈলাধার: এই ডিপোতে ১ লাখ টন জ্বালানি মজুত করার সুবিধা রয়েছে। ১৪টি ট্যাংকের মধ্যে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানিগুলো ভাগ করে ব্যবহার করলেও বছরের অধিকাংশ সময় ২০-২৫ শতাংশের বেশি ট্যাংক ব্যবহৃত হয় না।
  • যন্ত্রপাতির ক্ষয়: সচল জেটি সুবিধা ও সংযোজিত আধুনিক ফায়ার ফাইটিং এবং অপারেশনাল যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

কেন ভেড়েনি কোনো জাহাজ?

বিপিসির সাবেক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মতে, এই প্রকল্পের মূল বাধা হলো পশুর নদীর নাব্য সংকট
১. অপরিকল্পিত প্রকল্প: পশুর নদীতে গভীরতা কম থাকায় বড় কোনো তেলবাহী জাহাজ জেটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
২. ফিজিবিলিটি স্টাডির অভাব: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের মতে, প্রকল্পটি গ্রহণের আগে সঠিক ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। যদি হতো, তবে নদীর গভীরতা বিবেচনা না করে জেটি নির্মাণের মতো ঘটনা ঘটত না।
৩. ড্রেজিং সমস্যা: মোংলা বন্দরের পাশে হওয়ার সত্ত্বেও নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় জেটিটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে ডিজেল এনে নামমাত্র সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে।


জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের অনেক প্রকল্পই এমন অপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। যেখানে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মজুত বাড়ানোর কথা, সেখানে মোংলার মতো বড় ডিপোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারা চরম ব্যর্থতা। ছয় বছরে এক দিনের জন্যও জেটিটি ব্যবহার না হওয়া প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

বিপিসির সদ্য সাবেক পরিচালক ড. এ কে এম আজাদুর রহমানও স্বীকার করেছেন যে, গভীরতার সংকটের কারণেই মূলত জেটিটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুর নদীর ড্রেজিং নিশ্চিত করে জেটিটিকে সচল করা না গেলে এই বিশাল বিনিয়োগ পুরোপুরি বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।