দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের এক জরিপে দেখা গেছে, বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য পুরোনো পোশাকেই ফিরে যেতে আগ্রহী। প্রায় ২ লাখের বেশি সদস্যের এই বাহিনীতে ৯৬ শতাংশই আগের পোশাকে দায়িত্ব পালনের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি ডিআইজি (কন্ট্রোলিং) মো. কামরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দেশের সব জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) মাধ্যমে কল্যাণ সভা আয়োজন করে পোশাক সংক্রান্ত মতামত চাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় মোট ১,০৮,৬৪১ জন পুলিশ সদস্য নিজেদের মতামত দেন। এর মধ্যে মাত্র ৯১১ জন নতুন পোশাকের পক্ষে, ২,৮১৭ জন অন্য কোনো পোশাকের পক্ষে এবং ১,০৪,৯১৩ জন পুরোনো পোশাক পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টতই পুরোনো পোশাকের প্রতি বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক সমর্থন নির্দেশ করে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বুধবার (৪ মার্চ) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে মানসিক পরিবর্তনে জোর দিচ্ছে সরকার। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। শুধু পোশাক বদলালে মানসিকতার পরিবর্তন হয় না। তাই এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।”
অন্যদিকে, পুলিশের পোশাক নির্ধারণের এখতিয়ার সরকারের বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বলেন, “পুলিশের পোশাক নিয়ে যে মতামত জরিপ পরিচালিত হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পোশাক পুলিশের জন্য উপযোগী ও মানানসই।”
পোশাক পরিবর্তন সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর পর দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত বিশেষ কল্যাণ সভাগুলোতেও পুরোনো পোশাকের পক্ষে জোরালো মত উঠে এসেছে। নরসিংদী জেলা পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত এক সভায় উপস্থিত অধিকাংশ কর্মকর্তা পুরোনো পোশাক পরিধানের পক্ষে মত দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশের পোশাক কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক। ব্যবহারিক মান, নকশা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় পুরোনো পোশাকই সময়োপযোগী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের অংশ হিসেবে পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী পুলিশের জন্য আয়রন রঙ, র্যাবের জন্য অলিভ রঙ এবং আনসারের জন্য গোল্ডেন হোয়াইট রঙ নির্ধারণ করা হয়। তবে শুরু থেকেই অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য এই নতুন রঙের বিরোধিতা করে আসছিলেন, এমনকি ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ বলেও মন্তব্য করেন কেউ কেউ। তৎকালীন ১০০ জন পুলিশ সদস্যের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৯৫ জন নতুন পোশাক পরতে আগ্রহী ছিলেন না। প্রাথমিকভাবে রেলওয়ে পুলিশ, শিল্প পুলিশ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে নতুন পোশাক সরবরাহ করা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে, ১৬ মার্চ থেকে গ্রীষ্মকালীন পোশাক (হাফ হাতা ইউনিফর্ম) পরিধানের নিয়ম থাকলেও নতুন পোশাকের কোনো বরাদ্দ বা সরবরাহ এখনও নেই। ফলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে পুলিশ সদস্যরা পুরোনো হাফ হাতা পোশাকেই দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পুলিশের লোগো পরিবর্তনে (নৌকার পরিবর্তে শাপলা, ধান ও গমের শীষ যুক্ত করা) শতভাগ সমর্থন পাওয়া গেছে, নতুন পোশাকের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সদস্যের সরাসরি আপত্তি সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























