মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একজোট হয়ে কাজ করছে। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে ইরানের কুর্দি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ‘মাঠের সৈনিক’ (boots on the ground) হিসেবে ব্যবহার করে তেহরানের উপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলগত গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনার পথে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বহুমুখী কৌশলগত ও আঞ্চলিক বাধা।
এই গুঞ্জনের পেছনে রয়েছে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা। গত ২ ও ৩ মার্চ ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানপন্থি মিলিশিয়া কাতায়িব হিজবুল্লাহ ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) লজিস্টিক অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানে। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইতোমধ্যে কুর্দি বাহিনীকে সশস্ত্র করার কাজ শুরু করেছে। কূটনৈতিক স্তরেও তৎপরতা চোখে পড়ছে; সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকের কুর্দি আন্দোলনের প্রভাবশালী নেতা মাসুদ বারজানি এবং বাফেল তালবানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ কুর্দি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইরানের পাঁচটি কুর্দি দল মিলে ‘কোয়ালিশন অব পলিটিক্যাল ফোর্সেস অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান’ নামে একটি জোট গঠন করেছে, যা একটি সশস্ত্র বাহিনী ও কূটনৈতিক কমিটি গঠনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
তবে এই কৌশল কুর্দিদের জন্য নতুন নয়। বিশ্লেষকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, বিদেশি শক্তির ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে পরিত্যক্ত হওয়ার এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ইতিহাস রয়েছে কুর্দিদের। ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের উৎসাহ দিলেও পরে তাদের মাঝপথে একা ফেলে চলে যায়। সম্প্রতি সিরিয়াতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরাকের ফার্স্ট লেডি শানাজ ইব্রাহিম আহমেদ স্পষ্ট বার্তায় বলেছেন, ‘কুর্দিদের একা থাকতে দিন। আমরা ভাড়াটে নই।’ রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো বুরজু ওজচেলিকের মতে, সিরিয়ায় যেভাবে পিকেকে-কে ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছিল, ইরানেও পিজেএকে ব্যবহার করে সেই একই ‘কৌশল’ অনুসরণের চেষ্টা চলছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে আঞ্চলিক প্রতিরোধও প্রবল। আঙ্কারার সেন্টার ফর ইরান স্টাডিজের গবেষক ওরাল তোগা মনে করেন, ৮ থেকে ১০ হাজার সেনার একটি কুর্দি বাহিনী ইরানের সুসংহত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না। তোগা সতর্ক করে বলেন, ‘বিমান হামলা একসময় থেমে যাবে, কিন্তু তেহরান সব সময়ই এখানেই থাকবে।’ এর বাইরে, তুরস্ক কখনোই তার সীমান্তের কাছে নতুন কোনও কুর্দি রাষ্ট্র বা সত্তার উত্থান মেনে নেবে না, কারণ এতে তাদের নিজস্ব সীমানায় অস্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে। আজারবাইজানও এই হস্তক্ষেপের বিপক্ষে; বাকু স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সমর্থন করে না, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির ফেলো বারাক সিনার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের আসলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী? তারা কি ইরানকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, নাকি খণ্ডবিখণ্ড করতে চায়? সিনারের মতে, সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি বা সরাসরি সেনা সহায়তা ছাড়া কুর্দিদের ব্যবহার করা হবে একটি ‘কৌশলগত স্ববিরোধিতা’। ইসরায়েল প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের চেয়ে তাৎক্ষণিক জয়কে বেশি প্রাধান্য দেয়, যার ফলে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। সব মিলিয়ে, ইরানের কুর্দিদের সামনে এখন এক কঠিন পরীক্ষা। তারা কি বিদেশি শক্তির দাবার ঘুঁটি হবে, নাকি নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে এগোবে, এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গতিপথ।
রিপোর্টারের নাম 



















