সম্প্রতি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটিকে অনেকেই রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দলগুলোর মধ্যে যে একটি সৌজন্যমূলক সম্পর্ক জরুরি, এই ঘটনা তার ইঙ্গিত বহন করে। তবে প্রশ্ন হলো, এই নতুন রাজনৈতিক আবহ কি দেশের দীর্ঘদিনের বিভেদ ও শত্রুতামূলক সম্পর্ককে পেছনে ফেলে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে? বিশেষ করে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চকে ঘিরে কি এবার একটি জাতীয় ঐক্যের বার্তা দিতে পারবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক মতভিন্নতা প্রায়শই এমন চরম বিরোধে রূপ নেয়, যা একসময় শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। এর ফলস্বরূপ, ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত অনেক বিষয়, বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এমনই একটি ঐতিহাসিক দিন, যা বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস অসম্পূর্ণ। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এই দিনটিকে ঘিরেও একসময় রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেছে।
যদিও পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর গঠিত বিএনপি দীর্ঘদিন ৭ই মার্চ পালন থেকে বিরত ছিল, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে দলটি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি উদযাপন করে। সেসময় বিএনপি নেতারা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক এবং জনগণকে উদ্দীপ্তকারী হিসেবে স্বীকার করেন। তবে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসে; কেউ স্বাগত জানালেও কেউ কেউ একে ‘ভণ্ডামি’ আখ্যা দেন, বিএনপির শাসনামলে এই ভাষণ প্রচারে বাধা দেওয়ার ইতিহাস টেনে। ২০২৩ সালেও ৭ই মার্চ উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি থাকলেও, গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে দলটির পক্ষ থেকে এই দিনে কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির খবর পাওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দল। গত বছরের এক বিরাট অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছে, তখন সরকারি দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। তাদের সহনশীলতা ও আন্তরিকতা এখন অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হওয়া উচিত। এই মুহূর্তে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আর আওয়ামী লীগ নয়, বরং সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামী। এমন পরিস্থিতিতে, ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সংশ্লিষ্ট দিবসগুলোকে যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে রাখা যায়, তবে ৭ই মার্চ নিয়ে বিএনপির কোনো ‘অ্যালার্জি’ থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বছর তারা এই ঐতিহাসিক দিনে কোনো কর্মসূচি দেবে কি না? বিশেষ করে, যখন আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পাওয়ার ইঙ্গিত এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান থাকার মতো বিষয়গুলোও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েও জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। যেমন, বিএনপি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক প্রমাণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ২৫শে মার্চের ঘোষণাকে কৌশলে এড়িয়ে যায়। অথচ জিয়াউর রহমান নিজে কখনও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। একইভাবে, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা (বঙ্গবন্ধুর পক্ষে) যে সেই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের, বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে উজ্জীবিত করেছিল, এটিও একটি ঐতিহাসিক সত্য। অথচ আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে জিয়াউর রহমানের এই অবদানকে অস্বীকার করে তাকে ‘পাকিস্তানের চর’ আখ্যা দিয়েছে, এমনকি তার কবর সরিয়ে ফেলার দাবিও জানিয়েছে। এই ধরনের বিতর্কগুলো দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তিকে শত্রুতে পরিণত করেছে, যা থেকে তৃতীয় পক্ষ ফায়দা তুলেছে।
গত ১৫ বছরে ‘নির্মূলের রাজনীতি’ যদি পরিহার করা যেত এবং একটি সহনশীল গণতান্ত্রিক আবহ তৈরি করা যেত, তাহলে হয়তো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিতে পারতো না এবং গত বছরের অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগকেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতো না। এখন সময় পরিবর্তনের। একটি বিরাট অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও অনেক কিছু শিখিয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও কট্টরপন্থা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছিল, তা অনেকের মনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছিল। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই শঙ্কা কিছুটা হলেও দূর হয়েছে।
তবে, যদি অতীতের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি এবং মতভিন্নতার নামে শত্রুতামূলক চর্চা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভেতরে ভেতরে আরেকটি অস্থিতিশীলতার পটভূমি রচিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন অপরিহার্য। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত সত্যগুলোকে অস্বীকার না করে, বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে একটি জাতীয় ঐক্য স্থাপন এখন সময়ের দাবি। ৭ই মার্চ, ২৫ ও ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বরসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন অবস্থান থাকা বাঞ্ছনীয়। মুক্তিযুদ্ধের একটি অভিন্ন ও বিতর্কমুক্ত ইতিহাস থাকা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ যে শুধু একটি দলের সম্পত্তি নয়, বরং সমগ্র জাতির অর্জন, এই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে না পারলে দেশ কাঙ্ক্ষিত পথে এগোতে পারবে না।
রিপোর্টারের নাম 

























