মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরের রহস্যময় জগৎ এতদিন ছিল বিজ্ঞানের জন্য এক দুর্ভেদ্য ধাঁধা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এআই এখন শুধু আমাদের বলা কথা নয়, আমাদের ‘নীরব ভাষা’ বা মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা চিন্তাভাবনাও আংশিকভাবে পড়তে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯ বছর আগে স্ট্রোকে বাকরুদ্ধ ৫২ বছর বয়সী এক নারী, যিনি ‘টি১৬’ নামে পরিচিত, মস্তিষ্কে বসানো ক্ষুদ্র ইলেকট্রোডের মাধ্যমে মনে মনে শব্দ উচ্চারণ কল্পনা করলে এআই সিস্টেম তা নির্ভুলভাবে পর্দায় বাক্য হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে পারছে। একই গবেষণায় অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস (এএলএস) আক্রান্ত আরও তিনজন রোগীর ক্ষেত্রেও মিনিটে প্রায় ৩২টি শব্দ ৯৭.৫ শতাংশ নির্ভুলতার সঙ্গে টেক্সটে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে। গবেষকরা শুধু শব্দ নয়, স্বরের ওঠানামা, গতি ও আবেগও আংশিকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন, যা বাকরুদ্ধ রোগীদের জন্য যোগাযোগের এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
শুধু চিন্তাকে টেক্সটে রূপান্তর নয়, জাপানের গবেষকরা আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘মাইন্ড ক্যাপশনিং’ প্রযুক্তি দেখিয়েছেন। এটি মস্তিষ্কের নন-ইনভেসিভ স্ক্যান ব্যবহার করে মানুষ কী দেখছে বা কল্পনা করছে তার বিস্তারিত বর্ণনা তৈরি করতে পারে। নাগোয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ইউ তাকাগি এফএমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ থেকে মানুষ যে ছবি দেখছে, তার অনুরূপ ছবি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি সংগীত শোনার সময় মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে সংগীতের বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের চেষ্টাও চলছে, যদিও ছবির তুলনায় সংগীত পুনর্গঠন বেশি জটিল বলে জানানো হয়েছে।
মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনকারী ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ (বিসিআই) ধারণাটি নতুন না হলেও, ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকের প্রাথমিক সাফল্যের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই এবং মেশিন লার্নিংয়ের অভাবনীয় উন্নতির ফলে এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি অবিশ্বাস্য গতি লাভ করেছে। জটিল চিন্তা বা ভাষাকে ডিকোড করার চ্যালেঞ্জ এখন এআই-এর মাধ্যমে অনেক সহজ হয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আরও বেশি নিউরন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে এই প্রযুক্তি আরও নিখুঁত হবে। ইতোমধ্যে ইলন মাস্কের নিউরালিংকের মতো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক ব্রেন-চিপ বাজারে আনার চেষ্টা করছে। গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তি বাকরুদ্ধ রোগীদের জন্য যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পাশাপাশি এটি স্বপ্ন পুনর্গঠন, মানসিক রোগীদের বিভ্রম বোঝা কিংবা এক মস্তিষ্ক থেকে আরেক মস্তিষ্কে তথ্য আদান-প্রদানের মতো বৈপ্লবিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
তবে গবেষকরা নৈতিকতা ও গোপনীয়তার প্রশ্ন নিয়ে সতর্ক করেছেন। মানুষের মনের একান্ত ব্যক্তিগত জগত উন্মোচনের এই ক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের মনের গোপন জগত উন্মোচনে এখনও সময় লাগবে। সম্ভবত আরও ১০ থেকে ২০ বছর।
যদিও পূর্ণাঙ্গ ‘মনের কথা’ পড়তে এখনও সময় লাগতে পারে, তবুও এটুকু স্পষ্ট যে, এআই এখন শুধু আমাদের বলা কথা নয়, আমাদের না-বলা কথাও বুঝতে শিখছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
রিপোর্টারের নাম 

























