ঢাকা ০৩:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শিক্ষা সংস্কারে সমন্বিত আইন অপরিহার্য: ১২ দফা বাস্তবায়নে সাবেক উপদেষ্টার জোর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা সরকারের শিক্ষা সংস্কারে ঘোষিত ১২ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী শিক্ষা আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে প্রণীত শিক্ষা আইন গ্রহণযোগ্য নয়। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে সরকারের ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরে তিনি এ কথা জানান।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী তার বক্তব্যে আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তড়িঘড়ি করে যে শিক্ষা আইন করা হয়েছিল, গণসাক্ষরতা অভিযান তার সঙ্গে একমত নয় এবং তা গ্রহণযোগ্যও নয়। তিনি জানান, সরকার ঘোষিত ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, নতুন সরকার ঘোষিত ১২ দফায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, এটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা, টাস্কফোর্স গঠন এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটবে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে সরকারের ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে যেসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং তিন বছরে ধাপে ধাপে ‘ফিসক্যাল আপলিফট’ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়, এই বর্ধিত বরাদ্দ কোথায়, কীভাবে এবং কাদের জন্য ব্যয় হবে তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, বাল্যবিবাহের শিকার, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী (যেমন প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, চা বাগানের অধিবাসী) এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ চর, হাওর ও পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন ও ই-প্রকিউরমেন্ট: ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বাজেট অনুযায়ী ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে যথাযথ মেন্টরিং ও মনিটরিং জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়।
উন্নয়ন ব্যয়ে অগ্রাধিকার (মিড-ডে মিল, ল্যাব ও স্যানিটেশন): মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও খামারীদের কাছ থেকে নিরাপদ খাদ্য পণ্য সংগ্রহে উৎসাহিত করা এবং পণ্য সরবরাহে কোনো সিন্ডিকেট যেন গড়ে না ওঠে সে ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়। ধাপে ধাপে সব বিদ্যালয়গামী শিশুর জন্য মিড-ডে মিল নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে স্যানিটারি প্যাড সম্বলিত ‘ভেন্ডিং মেশিন’ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশীদারিত্বে যুক্ত করার কথা বলা হয়। এছাড়া, ওয়াশ ব্লকগুলোতে সুপেয় পানিসহ হাত ধোয়ার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়। একইসাথে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘পুনঃভর্তি ফি’ না নেওয়ার আদালতের নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের অনুরোধ করা হয়।
শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ পরিকল্পনা (‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’): এই কর্মসূচিকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আনবে বলে মনে করা হলেও, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেন্টরিং, মনিটরিং এবং ট্যাব সংক্রান্ত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বহুভাষিক বাংলাদেশ (তৃতীয় ভাষা শিক্ষা): বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শ্রমবাজার ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মন্তব্য করা হয়। তবে এই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু করাকে সংগত বলে মনে করা হয়। একইসাথে, বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অনলাইন রিসোর্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আদিবাসীদের মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
ইনোভেশন স্পেস (‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’): স্কুলগুলোতে ‘ইনোভেশন স্পেস’ প্রদানের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে পিকেএসএফ-এর উদ্যোগে একসময় চালু হওয়া ‘সততা স্টোর’-এর মতো উদ্যোগগুলোকেও উৎসাহিত করার কথা বলা হয়।
খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: মানসিক স্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও মেধা বিকাশের জন্য মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি জাতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের নানাবিধ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এজন্য ধাপে ধাপে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং বিকল্প হিসেবে স্কাউট বা গার্লস গাইড শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা হয়।
পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পর্যালোচনার সময় শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস ও শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়। কারিকুলাম পর্যালোচনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার্থীরা যেন অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইডনির্ভর না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করা হয়।
শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ (‘ন্যূনতম শিখন মান’): সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করার প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযান প্রস্তাব করে যে, বাংলাদেশে শিক্ষা প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় (কওমীসহ), ইংরেজি মাধ্যম এবং এনজিও পরিচালিত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় মনিটরিং এবং মেন্টরিং সাপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘সমন্বিত শিক্ষা আইন’ সময়ের দাবি, কেবল নীতিমালা দিয়ে কাজ হবে না।
ব্রিজ কোর্স: এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ সুগম করা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘ব্রিজ কোর্স’ চালুর সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলা হয়। তবে শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পর শিক্ষার্থীদের অ্যাপিটিউড অনুযায়ী পেশাগত বা বৃত্তিমূলক কোর্সে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা: গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণায় অভিজ্ঞ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া এবং সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিচালিত উন্নতমানের গবেষণার তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাই করে একটি জাতীয় ‘ডাটা ব্যাংক’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।
পাবলিক ড্যাশবোর্ড (জবাবদিহিতা): প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যবহুল নাগরিক ড্যাশবোর্ডটির মানোন্নয়ন এবং একইরকম ড্যাশবোর্ড সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও মন্ত্রণালয় অনুসরণ করার প্রস্তাব রাখা হয়।

রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন, সংবিধানে শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত হলেও নাগরিকের অধিকার হিসেবে এখনও স্বীকৃতি পায়নি। সার্বিক শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে দেশি ও প্রবাসী শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, গবেষক, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞসহ সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’ দ্রুত গঠনের অনুরোধ জানান তিনি। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ‘কনসালটেশন কমিটি’গুলোর রিপোর্টে উল্লেখিত সুপারিশগুলো বিবেচনা করার কথা বলা হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয় এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার সব স্তরে সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে মানকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে ঘাটতি পূরণে কর্পোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)-এর ৩০ শতাংশ ব্যবহার এবং ‘এডুকেশন সেস’ (সারচার্জ) চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী ভারতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে এডুকেশন সেস প্রবর্তন করে লক্ষাধিক কোটি টাকার ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়েছে, যা তাদের শিক্ষা বাজেটের অনেক ঘাটতি পূরণে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশও পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে, কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সাবেক এই উপদেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করাসহ জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট কৌশল, যথাযথ বিনিয়োগ ও এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশকে একটি সাক্ষর, মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি চলবে না; শিক্ষাঙ্গন হোক মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের কেন্দ্রবিন্দু, কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়।

সংবাদ সম্মেলনে গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশ স্বাগত বক্তব্য দেন। এছাড়াও এডুকেশন ওয়াচের আহ্বায়ক ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ভোট দেব আমরা, পদ পাবে অন্যরা—এই বৈষম্য চলতে পারে না’: পাহাড়ে সম-অধিকারের দাবি

শিক্ষা সংস্কারে সমন্বিত আইন অপরিহার্য: ১২ দফা বাস্তবায়নে সাবেক উপদেষ্টার জোর

আপডেট সময় : ০১:৩১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা সরকারের শিক্ষা সংস্কারে ঘোষিত ১২ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী শিক্ষা আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে প্রণীত শিক্ষা আইন গ্রহণযোগ্য নয়। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে সরকারের ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরে তিনি এ কথা জানান।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী তার বক্তব্যে আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তড়িঘড়ি করে যে শিক্ষা আইন করা হয়েছিল, গণসাক্ষরতা অভিযান তার সঙ্গে একমত নয় এবং তা গ্রহণযোগ্যও নয়। তিনি জানান, সরকার ঘোষিত ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, নতুন সরকার ঘোষিত ১২ দফায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, এটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা, টাস্কফোর্স গঠন এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটবে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে সরকারের ১২ দফার সঙ্গে সমন্বয় করে যেসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং তিন বছরে ধাপে ধাপে ‘ফিসক্যাল আপলিফট’ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়, এই বর্ধিত বরাদ্দ কোথায়, কীভাবে এবং কাদের জন্য ব্যয় হবে তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, বাল্যবিবাহের শিকার, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী (যেমন প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, চা বাগানের অধিবাসী) এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ চর, হাওর ও পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন ও ই-প্রকিউরমেন্ট: ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বাজেট অনুযায়ী ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে যথাযথ মেন্টরিং ও মনিটরিং জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়।
উন্নয়ন ব্যয়ে অগ্রাধিকার (মিড-ডে মিল, ল্যাব ও স্যানিটেশন): মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও খামারীদের কাছ থেকে নিরাপদ খাদ্য পণ্য সংগ্রহে উৎসাহিত করা এবং পণ্য সরবরাহে কোনো সিন্ডিকেট যেন গড়ে না ওঠে সে ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়। ধাপে ধাপে সব বিদ্যালয়গামী শিশুর জন্য মিড-ডে মিল নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে স্যানিটারি প্যাড সম্বলিত ‘ভেন্ডিং মেশিন’ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশীদারিত্বে যুক্ত করার কথা বলা হয়। এছাড়া, ওয়াশ ব্লকগুলোতে সুপেয় পানিসহ হাত ধোয়ার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়। একইসাথে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘পুনঃভর্তি ফি’ না নেওয়ার আদালতের নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের অনুরোধ করা হয়।
শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ পরিকল্পনা (‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’): এই কর্মসূচিকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আনবে বলে মনে করা হলেও, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেন্টরিং, মনিটরিং এবং ট্যাব সংক্রান্ত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বহুভাষিক বাংলাদেশ (তৃতীয় ভাষা শিক্ষা): বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শ্রমবাজার ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মন্তব্য করা হয়। তবে এই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু করাকে সংগত বলে মনে করা হয়। একইসাথে, বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অনলাইন রিসোর্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আদিবাসীদের মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
ইনোভেশন স্পেস (‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’): স্কুলগুলোতে ‘ইনোভেশন স্পেস’ প্রদানের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে পিকেএসএফ-এর উদ্যোগে একসময় চালু হওয়া ‘সততা স্টোর’-এর মতো উদ্যোগগুলোকেও উৎসাহিত করার কথা বলা হয়।
খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: মানসিক স্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও মেধা বিকাশের জন্য মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি জাতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের নানাবিধ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এজন্য ধাপে ধাপে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং বিকল্প হিসেবে স্কাউট বা গার্লস গাইড শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা হয়।
পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পর্যালোচনার সময় শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস ও শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়। কারিকুলাম পর্যালোচনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার্থীরা যেন অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইডনির্ভর না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করা হয়।
শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ (‘ন্যূনতম শিখন মান’): সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করার প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযান প্রস্তাব করে যে, বাংলাদেশে শিক্ষা প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় (কওমীসহ), ইংরেজি মাধ্যম এবং এনজিও পরিচালিত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় মনিটরিং এবং মেন্টরিং সাপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘সমন্বিত শিক্ষা আইন’ সময়ের দাবি, কেবল নীতিমালা দিয়ে কাজ হবে না।
ব্রিজ কোর্স: এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ সুগম করা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘ব্রিজ কোর্স’ চালুর সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলা হয়। তবে শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পর শিক্ষার্থীদের অ্যাপিটিউড অনুযায়ী পেশাগত বা বৃত্তিমূলক কোর্সে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা: গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণায় অভিজ্ঞ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া এবং সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিচালিত উন্নতমানের গবেষণার তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাই করে একটি জাতীয় ‘ডাটা ব্যাংক’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।
পাবলিক ড্যাশবোর্ড (জবাবদিহিতা): প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যবহুল নাগরিক ড্যাশবোর্ডটির মানোন্নয়ন এবং একইরকম ড্যাশবোর্ড সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও মন্ত্রণালয় অনুসরণ করার প্রস্তাব রাখা হয়।

রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন, সংবিধানে শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত হলেও নাগরিকের অধিকার হিসেবে এখনও স্বীকৃতি পায়নি। সার্বিক শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে দেশি ও প্রবাসী শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, গবেষক, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞসহ সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’ দ্রুত গঠনের অনুরোধ জানান তিনি। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ‘কনসালটেশন কমিটি’গুলোর রিপোর্টে উল্লেখিত সুপারিশগুলো বিবেচনা করার কথা বলা হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয় এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার সব স্তরে সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে মানকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে ঘাটতি পূরণে কর্পোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)-এর ৩০ শতাংশ ব্যবহার এবং ‘এডুকেশন সেস’ (সারচার্জ) চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী ভারতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে এডুকেশন সেস প্রবর্তন করে লক্ষাধিক কোটি টাকার ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়েছে, যা তাদের শিক্ষা বাজেটের অনেক ঘাটতি পূরণে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশও পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে, কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সাবেক এই উপদেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করাসহ জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট কৌশল, যথাযথ বিনিয়োগ ও এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশকে একটি সাক্ষর, মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি চলবে না; শিক্ষাঙ্গন হোক মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের কেন্দ্রবিন্দু, কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়।

সংবাদ সম্মেলনে গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশ স্বাগত বক্তব্য দেন। এছাড়াও এডুকেশন ওয়াচের আহ্বায়ক ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।