পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মিক পরিশুদ্ধি, সংযম ও খোদাভীতি অর্জনের এক অপার সুযোগ নিয়ে আসে। এটি কেবল পানাহার ত্যাগের মাস নয়, বরং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ প্রশিক্ষণকাল। অথচ আমাদের অসচেতনতা ও কিছু প্রচলিত অভ্যাসের কারণে অনেক সময় এই মহান ইবাদতটি নিছক প্রথা বা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। রমজানের পূর্ণ বরকত ও সওয়াব পেতে হলে এমন কিছু ভুল ও খামখেয়ালি বর্জন করা অপরিহার্য, যা আমাদের রোজার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
১. কাজ বা পরীক্ষার অজুহাতে রোজা না রাখা
অনেকেই পড়াশোনা, পরীক্ষা কিংবা দৈনন্দিন কঠোর পরিশ্রমের অজুহাতে রোজা পালন থেকে বিরত থাকেন। অথচ রমজান মাস আমাদের জাগতিক রুটিন বা ব্যস্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আসে না, বরং এর পবিত্রতা রক্ষা করেই আমাদের কাজ সাজাতে হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)। জাগতিক ব্যস্ততা বা কাজ কোনোভাবেই ফরজ ইবাদত ত্যাগের বৈধ কারণ হতে পারে না। বরং ইবাদতের মাধ্যমেই জীবনে ও কর্মে বরকত আসে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে অগ্রাধিকার দেয়, আল্লাহ তার সময় ও প্রচেষ্টায় বরকত দান করেন।
২. আচরণে রুক্ষতা বা মন্দ ভাষা ব্যবহার করা
রোজা রাখা অবস্থায় অনেকে মেজাজ খিটখিটে করে ফেলেন অথবা মন্দ ভাষা ব্যবহার করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা হলো একটি ঢাল।’ (বুখারি: ১৮৯৪)। এটি রাগ, অহংকার এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে আত্মরক্ষার ঢাল। মহানবী (সা.) আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, কেউ যদি তোমাকে গালি দেয় বা উসকানি দেয়, তবে বলো: ‘আমি রোজাদার।’ রমজান মাস আমাদের অন্তরকে প্রশিক্ষিত ও পরিশুদ্ধ করার জন্য আসে, মেজাজ দেখানোর জন্য নয়। গিবত, গালাগাল এবং কটু কথা রোজার সওয়াবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। অনেক আলেম বলেছেন, জিহ্বার গুনাহ রোজার সওয়াবকে এমনভাবে কমিয়ে দেয় যে, শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষুধা আর তৃষ্ণাই অবশিষ্ট থাকে। তাই নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা রোজার সার্থকতার জন্য অপরিহার্য।
৩. নামাজবিহীন রোজা : নিরর্থক উপবাস
রমজানের অন্যতম দুঃখজনক ভুল হলো নামাজ আদায় না করে রোজা রাখা। নামাজ ইসলামের প্রধান স্তম্ভ। নামাজ ছাড়া রোজা রাখা অনেকটা ভিত্তিহীন দালান গড়ার নিষ্ফল চেষ্টার মতো। নামাজহীন রোজা মূলত ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই নয়, যা আল্লাহর কাছে প্রকৃত ইবাদত হিসেবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কম। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন: ‘নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের ওপর ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা: ১০৩)। আমরা আল্লাহর জন্য পানাহার ত্যাগ করছি, অথচ তাঁর সামনে দাঁড়াতে পারছি না—এই ত্যাগের অর্থ কী? রমজান আমাদের পরিপূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা দেয়, আংশিক নয়।
৪. আলস্য ও অতিরিক্ত নিদ্রা
ক্ষুধা এড়াতে বা সময় কাটানোর জন্য সারাদিন ঘুমিয়ে থাকা রোজার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। রমজান অলসতার মাস নয়; এটি কর্ম, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। সাহাবিরা (রা.) রোজা রেখে যুদ্ধ করেছেন, জ্ঞান বিতরণ করেছেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেছেন। ইবাদত ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে রোজা পালন করাই প্রকৃত সার্থকতা। ঘুমিয়ে মূল্যবান সময় পার করা মানে হলো আল্লাহর দেওয়া বরকত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা।
৫. কোরআন খতমকে প্রতিযোগিতা বানানো
রমজান কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসে কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে শুধু দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টানোই কোরআন তিলাওয়াতের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। কোরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো এর অর্থ বোঝা, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করা এবং নিজের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো। একটি আয়াত বুঝে পড়া এবং তার ওপর আমল করা হাজারবার না বুঝে পড়ার চেয়েও উত্তম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করছেন: ‘তারা কি কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?’ (সুরা নিসা: ৮২)। চিন্তা ও উপলব্ধিবিহীন তিলাওয়াত হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে না। জীবন বদলে দেওয়া একটি আয়াত, শত পৃষ্ঠা দ্রুত পড়ার চেয়েও মূল্যবান। এখানে সংখ্যা নয়, বরং গুণগত মানই মুখ্য। খতম করুন, কিন্তু তার সঙ্গে কোরআনের অর্থ অনুধাবন ও আত্মপ্রয়োগের অনুশীলনও করুন।
৬. সময় অপচয় করা
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান। এ সময়ে একটি ফরজের সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং একটি নফল ইবাদত ফরজের সমান হয়ে যায়। অথচ আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা বা অন্যান্য বিনোদনে ব্যয় করে ফেলি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন: ‘সময়ের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।’ (সুরা আসর: ১-২)। সামাজিক মাধ্যমে স্ক্রল করা, অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা বা গেম খেলে রমজানের এই মূল্যবান সময় নষ্ট করা আমাদের একটি বড় ভুল। এ মাসটি আমাদের আমলের পুঁজি সংগ্রহের মাস। প্রতিটি মিনিট যেখানে হাজার গুণের সওয়াব বয়ে আনে, সেখানে বিনোদনের পেছনে সময় নষ্ট করা চূড়ান্ত বোকামি।
৭. ইফতার ও সাহরিতে সুন্নাহর লঙ্ঘন
অনেকেই অতিরিক্ত পরহেজগারি দেখাতে গিয়ে ইফতারে দেরি করেন, যা সুন্নাহর সুস্পষ্ট পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) সময় হওয়া মাত্রই ইফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবার অনেকে অলসতা বা অন্য কোনো কারণে সাহরি না খেয়েই রোজা রাখেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি এর ফলে বরকতময় একটি সুন্নাহ থেকে বঞ্চিত হওয়া। হাদিসে এসেছে: ‘তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি: ১৯২৩)। সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার ও সাহরি গ্রহণ করা রোজার বরকত ও পূর্ণতার জন্য জরুরি।
৮. শবেকদরকে শুধু ২৭ রমজানে সীমাবদ্ধ করা
আমরা অনেকেই শুধু ২৭ রমজানকে লাইলাতুল কদর মনে করে বাকি রাতগুলো ইবাদত ও দোয়া থেকে অবহেলায় কাটিয়ে দিই। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোয় (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) শবেকদর তালাশ করতে বলেছেন। তাই একটি নির্দিষ্ট রাতের ওপর নির্ভর না করে শেষ ১০ রাতের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে কাটানো উচিত, যেন কোনোভাবেই এই মহাসম্মানিত রাতটি হাতছাড়া না হয়। লাইলাতুল কদর হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম, তাই এর প্রতিটি সম্ভাব্য মুহূর্তে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা উচিত।
৯. অপচয় ও ইফতারের বিলাসিতা
বর্তমানে ইফতার মানেই যেন হরেক পদের খাবারের সমারোহ এবং বিলাসিতা। সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর মাত্রাতিরিক্ত ভোজন বা অপচয় রোজার মূল চেতনার পরিপন্থী। মনে রাখা প্রয়োজন, অতিরিক্ত খাবার আলস্য নিয়ে আসে এবং ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়। তাছাড়া রমজান হলো নফস দমনের মাস, প্রদর্শনীর নয়। অপচয়, বিলাসিতা এবং লোকদেখানো আয়োজন রোজা ও ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)। রমজান হলো মাগফিরাত ও ত্যাগের মাস। অথচ ইফতারের মেন্যু পরিকল্পনায় আমরা যতটা সময় দিই, দোয়া ও ইস্তিগফারে ততটা দিই না। তাই ইফতার হোক সাধারণ, কিন্তু অন্তর হোক পূর্ণ। খাবারে অপচয় যত কম হবে, বরকত তত বেশি আসবে।
১০. শুধু নিজের জন্য দোয়া করা
রমজান মাস সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মাস। অনেকে কেবল নিজের ও পরিবারের জন্য দোয়া করলেও বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা মুসলিম উম্মাহর কথা ভুলে যান। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নির্যাতিত, ক্ষুধার্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। রোজাদারের দোয়া আল্লাহর দরবারে বিশেষভাবে কবুল হয়, তাই এই সুযোগে সমগ্র উম্মাহর কল্যাণ কামনায় হাত তোলা উচিত।
পবিত্র রমজান মাস আমাদের সামনে নিজেকে আমূল বদলে ফেলার এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের ছোট-বড় কিছু ভুল। লোকদেখানো আচার আর অভ্যাসের রোজা নয়, বরং আসুন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সঠিক পদ্ধতিতে রোজা পালন করি। আমাদের রোজা হোক তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম, কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মহড়া নয়, বরং হোক আত্মিক উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সফল সিঁড়ি।
রিপোর্টারের নাম 

























