পবিত্র রমজান মাস কেবল পানাহার বর্জন বা আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সময় নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও ‘তাকওয়া’ অর্জনের এক বিশেষ মৌসুম। মুমিন মুসলমানরা এ মাসে রোজা, তারাবিহ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিরন্তর চেষ্টা করেন। তবে ইবাদতের এই পূর্ণতা তখনই সম্ভব, যখন একজন রোজাদার তার যাপিত জীবনের সব ধরনের পাপাচার ও মন্দ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হন। মূলত সারা বছর পাপমুক্ত থাকার এক মাসব্যাপী নিবিড় প্রশিক্ষণই হলো রমজান।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তরে খোদাভীতি জাগ্রত করা। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা)। তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ হলো—সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভব হৃদয়ে জাগ্রত রাখা এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ভয়ে যাবতীয় নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীতেও রোজার সময় চারিত্রিক শুদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও অন্যায় কাজ বর্জন করল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ অর্থাৎ কেবল অভুক্ত থাকাই রোজার সার্থকতা নয়, বরং চিন্তা ও কর্মে কলুষমুক্ত হওয়া জরুরি। এছাড়া রোজাদারকে ঝগড়া-বিবাদ ও অশ্লীল ভাষা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ গায়ে পড়ে বিবাদে জড়ালেও ‘আমি রোজাদার’ বলে নিজেকে সংযত রাখার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।
বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনুল কায়িম (রহ.)-এর মতে, সিয়ামের মূল লক্ষ্য হলো আত্মাকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করা এবং উচ্চতর আধ্যাত্মিক সুখান্বেষণে নিজেকে প্রস্তুত করা। তাই রমজানে ব্যক্তিগত জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ সব ফরজ বিধান পালনের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও শুদ্ধতা বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে।
ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় রমজানের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। গিবত বা পরনিন্দা, হিংসা, মিথ্যাচার, অহংকার, দুর্নীতি, সুদ ও ঘুষের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখার এখনই উপযুক্ত সময়। রমজান আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে লোভ-লালসা বিসর্জন দিয়ে অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হয়। এই এক মাসের আত্মসংযম ও ইবাদতের অভ্যাস যেন বছরের বাকি এগারো মাসও আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি মুমিনের অগ্রসর হওয়া উচিত। মূলত পাপাচারমুক্ত সুন্দর জীবন গঠনের এক বৈশ্বিক পাঠশালাই হলো পবিত্র রমজান।
রিপোর্টারের নাম 

























