চলতি রমজানে দেশে মৌসুমি ফলের সংকট থাকায় সাধারণ মানুষের ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমদানি করা ফল। চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা রেকর্ড পরিমাণ ফল আমদানি করলেও খুচরা বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফল আমদানির পরও গত বছরের তুলনায় এবার দাম বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ। এমনকি প্রতিদিন কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের।
আমদানি তথ্যানুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর ফল আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর এই সময়ে যেখানে ২ লাখ ১৩ হাজার ৬০৭ টন ফল আমদানি হয়েছিল, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৪ টনে। পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে পাড়ার দোকান কিংবা ফুটপাতের ভ্যান—সবখানেই আপেল, আঙুর, মাল্টা ও কমলার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এসবের দাম।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ ফল খালাস করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬ হাজার ৯৯১ টন আপেল, ৪৪ হাজার ৪৫৬ টন আঙুর, ৫০ হাজার ৩১৬ টন মাল্টা এবং ৫৬ হাজার ৯৯৫ টন কমলা রয়েছে। এছাড়া ৪১ হাজার ১৮৬ টন খেজুরও বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে। এসব পণ্য থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা মূল্যের ফল খালাস করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের শুল্ক ও কর বাবদ গুনতে হয়েছে ২ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে রমজান শেষে এই আমদানির অঙ্ক ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে উচ্চ শুল্ক হারকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আমদানিকারকরা। ব্যবসায়ীদের দাবি, খেজুর ছাড়া প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে বর্তমানে ১৩৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সরকার ফলকে ‘বিলাসী পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করায় এই উচ্চ করভার সাধারণ ক্রেতাদের ওপর এসে পড়ছে। এছাড়া পচনশীল পণ্য হওয়ায় ফ্রিজিং কন্টেইনার ভাড়া এবং বন্দর থেকে দ্রুত খালাসের জন্য অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়কেও দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা।
এদিকে বন্দর ও পাইকারি বাজারগুলোতে ফলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তুলেছে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের মতে, আমদানির তথ্যের সঙ্গে বাজারের সরবরাহের বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে যাতে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো যায়। বিশেষ করে রমজানের শুরুতে এক দফা, মাঝামাঝি সময়ে এক দফা এবং ঈদের আগে আরেক দফা—এই তিন ধাপে দাম বাড়ানোর একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানিকৃত ফল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে শুল্ক হার কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্দর থেকে খালাস হওয়া পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে এবং সিন্ডিকেটের কারসাজি রুখতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি জরুরি। অন্যথায় রেকর্ড আমদানির সুফল সাধারণ ভোক্তাদের পরিবর্তে কেবল মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটেই যাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























