ঢাকা ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিক্ষোভ ও নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়লেন আহসান মনসুর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

কর্মকর্তাদের তীব্র বিক্ষোভ, আল্টিমেটাম এবং নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়লেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বুধবার তার প্রস্থানের পরপরই সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চত্বরে কর্মকর্তাদের স্লোগান ও হট্টগোলে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সকালে, যখন ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’-এর ব্যানারে তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ বাতিল ও বদলি প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সভা শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা গভর্নরের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের অভিযোগ তুলে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, দাবি মানা না হলে বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি পালন করা হবে।

প্রতিবাদ সভায় অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, স্বায়ত্তশাসনের বদলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এখন ‘স্বৈরশাসন’ চলছে। তিনি অভিযোগ করেন, ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে এবং কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা হচ্ছে। একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএফআইইউ-এর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরী।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুপুর ২টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন আহসান এইচ মনসুর। সেখানে তিনি কর্মকর্তাদের এই আন্দোলনকে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্যাংক একীভূতকরণ ও রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে কর্মকর্তাদের প্রশ্ন তোলার কোনো এখতিয়ার নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি এখানে সেবা দিতে এসেছি, চাকরি করতে নয়। পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড সময় লাগবে, তবে সবকিছু প্রশাসনিক নিয়মেই হওয়া উচিত।”

সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়লে আহসান এইচ মনসুর তড়িঘড়ি করে অফিস ত্যাগ করেন। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ এবং নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকে হেনস্তা করে ব্যাংক থেকে বের করে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল কর্মকর্তা আহসান উল্লাহকে ঘাড় ধরে গাড়িতে তুলে দেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ সময় আরও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ ও ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গভর্নরের সমালোচনা করায় তিন কর্মকর্তাকে শোকজ ও ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল। তবে বুধবার নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর আসার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ ওই তিন কর্মকর্তার বদলি আদেশ বাতিল করে তাদের নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল করেছে। মূলত এই কর্মকর্তাদের কেন্দ্র করেই গত কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উত্তপ্ত ছিল, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটল আজ আহসান এইচ মনসুরের বিদায়ের মধ্য দিয়ে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

বিক্ষোভ ও নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়লেন আহসান মনসুর

আপডেট সময় : ০৮:০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কর্মকর্তাদের তীব্র বিক্ষোভ, আল্টিমেটাম এবং নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়লেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বুধবার তার প্রস্থানের পরপরই সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চত্বরে কর্মকর্তাদের স্লোগান ও হট্টগোলে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সকালে, যখন ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’-এর ব্যানারে তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ বাতিল ও বদলি প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সভা শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা গভর্নরের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের অভিযোগ তুলে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, দাবি মানা না হলে বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি পালন করা হবে।

প্রতিবাদ সভায় অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, স্বায়ত্তশাসনের বদলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এখন ‘স্বৈরশাসন’ চলছে। তিনি অভিযোগ করেন, ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে এবং কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা হচ্ছে। একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএফআইইউ-এর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরী।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুপুর ২টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন আহসান এইচ মনসুর। সেখানে তিনি কর্মকর্তাদের এই আন্দোলনকে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্যাংক একীভূতকরণ ও রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে কর্মকর্তাদের প্রশ্ন তোলার কোনো এখতিয়ার নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি এখানে সেবা দিতে এসেছি, চাকরি করতে নয়। পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড সময় লাগবে, তবে সবকিছু প্রশাসনিক নিয়মেই হওয়া উচিত।”

সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়লে আহসান এইচ মনসুর তড়িঘড়ি করে অফিস ত্যাগ করেন। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ এবং নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকে হেনস্তা করে ব্যাংক থেকে বের করে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল কর্মকর্তা আহসান উল্লাহকে ঘাড় ধরে গাড়িতে তুলে দেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ সময় আরও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ ও ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গভর্নরের সমালোচনা করায় তিন কর্মকর্তাকে শোকজ ও ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল। তবে বুধবার নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর আসার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ ওই তিন কর্মকর্তার বদলি আদেশ বাতিল করে তাদের নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল করেছে। মূলত এই কর্মকর্তাদের কেন্দ্র করেই গত কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উত্তপ্ত ছিল, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটল আজ আহসান এইচ মনসুরের বিদায়ের মধ্য দিয়ে।