পবিত্র রমজানের সপ্তম তারাবিতে আজ পাঠ করা হবে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের দশম পারা। এই অংশে সূরা আনফালের শেষাংশ (৪১-৭৫) এবং সূরা তাওবার প্রথমাংশ (১-৯৩) তেলাওয়াত করা হবে। বদরের রণহুঙ্কার থেকে তাবুকের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এই পারা মুসলিম উম্মাহকে জিহাদ, আল্লাহর নুসরত (সাহায্য) ও হিজরতের গভীর বার্তা দেয়। একইসঙ্গে উন্মোচন করে মুনাফিকদের মুখোশ এবং পরীক্ষা করে ঈমানের দৃঢ়তা।
আজকের তারাবিতে পঠিতব্য দশম পারার শুরুতেই সূরা আনফালের (৪১-৭৫) অংশে গনিমতের সম্পদ বণ্টনের নীতিমালা এবং বদর যুদ্ধের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই যুদ্ধে শয়তানের প্ররোচনা এবং ফেরেশতাদের মাধ্যমে কাফেরদের দমনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। জিহাদের ময়দানে আত্মিক বল ও রুহানি শক্তি অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহর সাহায্য লাভের জন্য দৃঢ় অবস্থান, অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য, মতভেদ ও অহংকার পরিহার এবং ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় জীবনে উত্থান-পতনের মূলনীতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে এবং বদর যুদ্ধের বন্দি সমস্যার সমাধান বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আনসার, মুহাজির ও মুজাহিদদের পুরস্কার ও মর্যাদার বর্ণনা দিয়ে এই সূরা সমাপ্ত হয়েছে, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ ও সাহায্য-সহযোগিতার আলোচনাই ছিল প্রধান বিষয়।
মদিনায় অবতীর্ণ সূরা তাওবার সূচনা হয়েছে ‘বারাআত’ শব্দটি দিয়ে, যার অর্থ হলো সম্পর্কচ্ছেদ বা দায়মুক্ত হওয়া। নবম হিজরিতে রোমানদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত গাজওয়া তাবুকের প্রেক্ষাপটে এই সূরা অবতীর্ণ হয়। সূরা তাওবার মৌলিক আলোচনা দুটি প্রধান বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে: প্রথমত, মুশরিক ও আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে জিহাদের বিধানাবলি বর্ণনা এবং দ্বিতীয়ত, গাজওয়া তাবুকের প্রেক্ষাপটে মুনাফিকদের আসল চেহারা উন্মোচন। জিহাদের বিধান বর্ণনার আগে বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলমানদের পুরনো চুক্তি বাতিল এবং মুশরিকদের কাবা শরিফ ঘিরে হজ-ওমরাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের অপবিত্রতা, একাধিকবার চুক্তিভঙ্গ এবং ইসলামের অগ্রযাত্রা রোধে ইহুদিদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সূরায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, তাঁর রাসুল (সা.) এবং জিহাদের চেয়ে কোনো কিছুই যেন মুসলমানদের কাছে অধিক প্রিয় না হয়। মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পাশাপাশি আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কূটচক্র, ধোঁকা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, কপটতা এবং অন্যান্য মন্দ দোষ সম্পর্কে মুসলমানদের সতর্ক করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা লড়াই করো তাদের বিরুদ্ধে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে না, হারামকে হারাম মনে করে না এবং সত্য ধর্মের অনুসরণ করে না; তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাও, যতক্ষণ না তারা লাঞ্ছিত হয়ে নিজ হাতে জিজিয়া প্রদান করে।”
এই সূরার অন্যতম একটি বিষয় হলো মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করা। এ কারণেই এর আরেকটি নাম ‘সূরাতুল ফাজিহাহ’ বা ‘লাঞ্ছনাকারী সূরা’। এই সূরা নাযিল হওয়ার আগে মুনাফিকরা নিজেদের মুসলমান দাবি করলেও আড়ালে কুফর গোপন রাখত। কিন্তু এই সূরা তাদের গোপন অবস্থা এমনভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে যে, কে মুনাফিক আর কে মুখলিস মুমিন, তা আর কারও অজানা থাকেনি। মুনাফিকদের দুর্বলতা ও গোপন দোষগুলো প্রকাশের বাহ্যিক কারণ ছিল তাবুক যুদ্ধ। স্বভাবতই জিহাদ একটি প্রাণ ঝুঁকিপূর্ণ ইবাদত। গাজওয়া তাবুক ছিল বস্তুগত বিচারে তৎকালীন সবচেয়ে বড় শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা, তাও আবার প্রচণ্ড গরম ও অভাব-দারিদ্র্যের দিনে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে মুনাফিকদের আসল চেহারা প্রকাশ পেয়ে যায়। সে সময় মুনাফিকদের যে আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল, তা সব যুগের সকল মুনাফিকেরই চিত্র। আমাদের নিজেদের ঈমানের খাঁটিত্ব যাচাইয়ের জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাজওয়া তাবুকের প্রেক্ষাপটে মুনাফিকদের যেসব দুর্বলতা ও গোপন দোষ প্রকাশ পেয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল—মিথ্যা অজুহাত পেশ করা, ছলচাতুরি, জিহাদে না যাওয়ার জন্য হাস্যকর আপত্তি তোলা, মুসলিম সমাজে ফিতনা ছড়ানো, মুসলমানদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করা, তাদের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা, মিথ্যা শপথ করা, সম্পদ পেলে খুশি হওয়া আর না পেলে ক্ষোভ প্রকাশ করা, আল্লাহর মহব্বত, জিকির ও শুকরিয়া থেকে অন্তর শূন্য থাকা এবং নবীজিকে কটূক্তি করা। এছাড়াও একে অপরকে মন্দ কাজের আদেশ দেওয়া, ভালো কাজ থেকে নিষেধ করা এবং কৃপণতাও ছিল তাদের চরিত্রের অংশ। মূলত, মুনাফিকদের এসব দোষ ও কার্যকলাপ পূর্ববর্তী কাফেরদের চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। কাফেরদের সঙ্গে মুনাফিকদের সাদৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে কওমে নুহ, আদ, সামুদ, কওমে ইবরাহিম, আসহাবে মাদয়ান ও কওমে লুতের মতো জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ভয়াবহ পরিণতি জানা সত্ত্বেও এরূপ আচরণ সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। দশম পারার শেষ পর্যন্ত মুনাফিকদের আলোচনাই রয়েছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এ ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, “হে আমার রাসুল, যদি আপনি তাদের জন্য সত্তরবার ইস্তেগফার করেন, তবুও আল্লাহ কিছুতেই তাদের মাফ করবেন না।” এ কথাও বলেছেন যে, “যদি তাদের কারও মৃত্যু হয় তাহলে আপনি তার জানাজার নামাজ পড়াবেন না।”
দশম পারার শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা এমন একনিষ্ঠ মুসলমানদের কথাও আলোচনা করেছেন, যারা বার্ধক্য, তীব্র অসুস্থতা অথবা যুদ্ধ সরঞ্জামের অভাবে জিহাদে অংশ নিতে পারেননি। কিন্তু তাদের অন্তরের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল ছিল যে, জিহাদে যেতে না পারার দুঃখে তাদের চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। এই একনিষ্ঠ ও মাজুর (অক্ষম) মুসলমানদের জিহাদে অংশ না নেওয়ায় কোনো গুনাহ হবে না বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। এই অংশটি একদিকে যেমন মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন করে, তেমনি খাঁটি ঈমানদারদের গভীর নিষ্ঠা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
রিপোর্টারের নাম 























