মিয়ানমারে জান্তা সরকারের বিতর্কিত নির্বাচন এবং বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিষেকের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বেসামরিক সরকারের আড়ালে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যা চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো শক্তিগুলো স্বাগত জানিয়েছে। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ রাখাইন রাজ্যের বাস্তবতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
রাখাইনের বর্তমান রণক্ষেত্র ও প্রশাসনিক চিত্র
মিয়ানমারের ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ২৬৫টিতে জান্তা ভোট করতে পেরেছে। রাখাইন রাজ্যের প্রায় পুরো ভূখণ্ড বর্তমানে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (AA) নিয়ন্ত্রণে। জান্তা বাহিনী স্থলযুদ্ধে পিছু হটে এখন বেসামরিক গ্রামগুলোতে নৌ ও বিমান হামলা জোরদার করেছে। বিশেষ করে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীনা করিডোরের নিকটবর্তী এলাকাগুলোতে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে।
চীনের দ্বিমুখী কৌশল ও করিডোর নিরাপত্তা
বেইজিংয়ের কাছে মিয়ানমার ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একমাত্র ‘ল্যান্ড ব্রিজ’। রাখাইন থেকে ইউনান পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং প্রস্তাবিত রেললাইন মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমাবে। চীন বর্তমানে জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলেও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখছে। কিন্তু রাখাইনে জান্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় চীনের এই শত কোটি ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের অবস্থান ও জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ১৯৭৮ সালের সফল কূটনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক চাপ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মাত্র এক বছরের মধ্যে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ওই সময় বার্মা সরকার রোহিঙ্গাদের ‘বৈধ বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল।
বর্তমান সরকারও সেই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে যে, বর্তমানে রাখাইনে তিনটি মৌলিক উপাদানের অভাব রয়েছে:
নিরাপত্তা: চলমান সংঘাতের মধ্যে প্রত্যাবাসিতদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কেউ নেই।
নাগরিকত্ব: মিয়ানমারের নতুন কাঠামোতে রোহিঙ্গাদের অধিকারের কোনো স্বীকৃতি নেই।
রাজনৈতিক সমঝোতা: আরাকান আর্মি ও জান্তার মধ্যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি নেই।
সংকটের বহুমাত্রিকতা
রাখাইন এখন কেবল মানবিক সংকট নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে জান্তা বাহিনীর পরাজয় এবং অন্যদিকে আরাকান আর্মির প্রভাব বৃদ্ধি—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে রোহিঙ্গারা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ এবং সীমান্ত সংযোগ প্রকল্পের স্বার্থে ভারত ও থাইল্যান্ডও জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী, যা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 


















