বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত ব্যাপক রদবদল এসেছিল, এমনকি সংসদের স্পিকারও পদত্যাগ করেছিলেন, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কীভাবে স্বপদে টিকে থাকলেন—তা অনেকের কাছেই ছিল এক বড় প্রশ্ন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি নিজেই সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন, যেখানে তিনি তার ‘দুঃসময়ে’ বিএনপির ‘শতভাগ সহযোগিতার’ কথা উল্লেখ করেছেন।
শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্রুত পরিবর্তন আসে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল এবং সংসদের স্পিকারও অজ্ঞাত অবস্থান থেকে পরে পদত্যাগ করেন। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমপক্ষে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির অপসারণ কিংবা পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বড় ধরনের চাপ তৈরি হলেও মো. সাহাবুদ্দিন তার পদে অনড় থাকেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনিই নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়িয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার টিকে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বিএনপি জোট এবং সশস্ত্র বাহিনী তাকে আশ্বস্ত করে ও সমর্থন যোগায়। তিনি এও অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তার দপ্তরের প্রেস উইং বন্ধ করে দিয়েছিল। এছাড়া, বিদেশ সফরের পর নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে সফর বা চুক্তির বিষয়ে অবহিত না করার অভিযোগও করেছেন তিনি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। এমনকি, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তাকে অবহিত না করেই রাষ্ট্রপতির ছবি নামানো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের একজন সাবেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে একই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কেন অনড় ছিল বিএনপি
তাহলে প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়কালে বিএনপি কেন রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং তাকে স্বপদে বহাল রাখতে অনড় ছিল?
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি যখন জোরালো হচ্ছিল, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন। তারা তখন ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে’, ‘সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে’ কিংবা ‘নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে’—এমন যুক্তির অবতারণা করেছিলেন। তবে বর্তমানে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে কোনো আলোচনার কথা তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল এমন যে, এটিকে কেন্দ্র করে দেশের স্থিতিশীলতায় কোনো সংকট যেন না হয়, যা সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিপন্ন করতে পারত। তার মতে, বিএনপি তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা ও দ্রুত নির্বাচন আদায়ের নীতি গ্রহণ করেছিল। তারা মনে করেছিল, শেখ হাসিনার পতনের পর যখন সবকিছু সংবিধান অনুসরণ করেই চলছিল, তখন অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে তা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চেয়ে আসছিল এবং নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়বে এমন কোনো কিছুতেই দলটি সায় দিতে রাজি ছিল না। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনিশ্চিত হোক, সেটি তারা চায়নি। কারণ তারা জানত যে, যত দ্রুত নির্বাচন হবে তত তারা ভালো করবে। এজন্যই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিল।”
বিএনপি নেতারা তখন যা বলেছিলেন
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে ঢাকায় ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের পরের দিন, ২৩ অক্টোবর, বিএনপির তিনজন জ্যেষ্ঠ নেতা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাষ্ট্রপতির বিষয়ে আলোচনা করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দেশে যাতে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে খেয়াল রাখতে বলেছেন। একই দিনে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হবে। তাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায় না বিএনপি। তিনি তখন বলেছিলেন, “এই পদটা একটা সাংবিধানিক পদ, একটা প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে হঠাৎ করে পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সংকটের সৃষ্টি হবে।”
অপসারণ বা পদত্যাগের দাবি কখন উঠেছিল
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে। যদিও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তার কাছেই শপথ নিয়েছিল। ড. ইউনূস শপথ নেওয়ার পর আর কখনো বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর থেকে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সফরের বিস্তারিত জানানো কিংবা কোনো চুক্তি হলে তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার যে রাষ্ট্রাচারের চর্চা ছিল, সেটিও তিনি মানেননি।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর ১৯ অক্টোবর একটি দৈনিক পত্রিকায় রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এতে তিনি দাবি করেছিলেন, “তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।” এ ঘটনায় তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও শেখ হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা বিরোধী বিভিন্ন সংগঠন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তখন মন্তব্য করেছিলেন যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মিথ্যাচার করেছেন।
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে গণজমায়েত কর্মসূচি শুরু করে। ওই দিন বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নেয় একদল বিক্ষোভকারী। ইনকিলাব মঞ্চ, রক্তিম জুলাই’ ২৪, ৩৬ জুলাই পরিষদ, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদসহ বিভিন্ন নামে আলাদা আলাদা বিক্ষোভ শুরু হয় বঙ্গভবনের সামনে। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনের রাস্তা অবরোধের পর রাতে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে এসব সংগঠনের কর্মীরা। পরে সেই রাতে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ওই দিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি অবশ্য তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীরা তাদের লোক নয় এবং তারা এগুলো ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির বিষয়ে কী বলেছেন রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে তাকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই সময় বিএনপির “উচ্চপদে আসীন” নেতারা তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।” রাষ্ট্রপতি আরও জানান, তাকে অপসারণের ওই উদ্যোগটি এসেছিল গণঅভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে। তখন দলগুলো ও অন্তর্বর্তী সরকার একটি সিদ্ধান্তে আসে যে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেই কেবল তিনি অপসারিত হবেন। তিনি বলেন, “আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।”
মো. সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাকে তখন এই বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তিনি যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অবিচল থাকেন এবং কোনো অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে তারা নয়। তিনি আরও দাবি করেন, “এছাড়া তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব। শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে।”
ওই সময়টিকে কঠিন সময় আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিলেন এবং তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। “বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতুহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল,” বলেছেন রাষ্ট্রপতি।
রিপোর্টারের নাম 





















