পবিত্র রমজান মাস এবং আল-কোরআন যেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এই মাসটি কোরআন নাজিলের মাস, যা মুমিন হৃদয়ে এনে দেয় এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। কোরআনের স্পর্শ ছাড়া মানব জীবন যেন অর্থহীন, আর রমজানে এর স্পর্শে মৃতপ্রায় হৃদয় সজীব হয়ে ওঠে, নেমে আসে হেদায়াতের বসন্ত। এই বসন্ত পূর্ণতা পায় তারাবির সালাতে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে, যা রবের সাথে একান্তে আলাপের এক অমূল্য সুযোগ।
রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের মাহাত্ম্য:
সারাদিনের সিয়াম সাধনার পর শরীরে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। কিন্তু কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ মুমিনরা সব ক্লান্তি উপেক্ষা করে মসজিদে ছুটে যান। এশার ফরজ নামাজের পর তারা ডুব দেন রবের প্রেমের সাগরে, তারাবির সালাতে। এখানে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তারা মহান আল্লাহর সাথে এক গভীর ও আত্মিক আলাপে মগ্ন হন। এই আলাপচারিতার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রশ্ন জাগে, কেন রমজানে কোরআন তিলাওয়াত এত মধুর লাগে? কেন বারবার তিলাওয়াত ও শ্রবণ করেও আশ মেটে না?
এর মূল কারণ হলো, রমজান মাস হলো কোরআন নাজিলের মাস। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।” (সুরা বাকারা: ১৮৫)। এই মাসে কোরআনের আলোয় অন্তর ভরে ওঠে এবং তারাবির সালাতে তা পূর্ণতা লাভ করে। এটাই রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের স্বাদে মোহিত হওয়ার মৌলিক রহস্য।
কোরআনের সুরে মুখরিত বাংলাদেশ:
এক সময় বাংলাদেশে হাফেজে কোরআনের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু আলেম সমাজের নিরলস প্রচেষ্টায় আজ লাখ লাখ হাফেজ তৈরি হচ্ছেন। এর ফলে দেশের প্রায় তিন লাখ মসজিদ রমজানে কোরআনের সুমধুর তিলাওয়াতে মুখরিত থাকে। এমনকি অনেক বাসাবাড়ি ও অফিসেও তারাবির জামাতে হাফেজরা কোরআন তিলাওয়াত করেন। এটি বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট গৌরব ও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার।
তারাবির রাকাত সংখ্যা: বিতর্কের ঊর্ধ্বে
তারাবির সালাত ২০ রাকাত—এটাই সঠিক মাসয়ালা। নবী করিম (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ২০ রাকাত তারাবি আদায় করেছেন, এর পক্ষে অসংখ্য দলিল রয়েছে। ইসলামি বিশ্বে সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকেই ২০ রাকাত তারাবি প্রচলিত। কিছু কুচক্রী মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস হিসেবে ৮ রাকাত তারাবির প্রোপাগান্ডা ছড়ালেও, প্রাজ্ঞ আলেমদের প্রতিরোধে তা আজ ম্লান। তাই এসব প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত না হয়ে ২০ রাকাত তারাবিতে কোরআন শোনা ও হৃদয় আলোকিত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তাড়াহুড়ো নয়, তারতিলের সঙ্গে পাঠ:
কিছু অতিউৎসাহী মানুষ, যারা কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে না, তারা হাফেজদের ওপর দ্রুত তিলাওয়াতের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। এটি নিন্দনীয়। কোরআনের নির্দেশনা হলো, তারতিল বা ধীরে-সুস্থে তিলাওয়াত করা। তাড়াহুড়ো করলে অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে, যা ধৃষ্টতার শামিল। তাই তারতিলের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া অপরিহার্য।
কোরআনের শিক্ষা গ্রহণে প্রয়াস:
সওয়াবের জন্য কোরআন তিলাওয়াতের অর্থ বোঝা জরুরি নয়। না বুঝে পড়লে বা শুনলেও প্রতি হরফে নেকি রয়েছে। তবে কোরআন থেকে পরিপূর্ণ উপকৃত হতে হলে এর নির্দেশনা ও শিক্ষা জানা অত্যাবশ্যক। কোরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এর আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং উপদেশ গ্রহণ করা।
নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ বা প্রাসঙ্গিক বইয়ের আলোকে তারাবিতে পঠিত অংশটুকুর তাফসির দেখে নিয়ে আমরা কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে, যথাযথ পন্থায় সিয়াম সাধনা, সালাতুত তারাবিহ এবং কোরআন মাজিদের প্রতি আত্মনিয়োগের মাধ্যমে আসুন আমরা আমাদের রমজানকে অর্থবহ করে তুলি। হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ুক কোরআনের বসন্ত, আর তাকওয়ার সৌরভে সুরভিত হোক প্রতিটি মানব জীবন।
(লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী)
রিপোর্টারের নাম 























