ঢাকা ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজানের পঞ্চম তারাবি: আল্লাহর বিধান ও জীবনের শিক্ষা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১৪:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র রমজান মাসে আজ রোববার অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চম তারাবি। এই রাতে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সূরা মায়েদার ৮৩ থেকে ১২০ নম্বর আয়াত, সূরা আনআম সম্পূর্ণ (১৬৫ আয়াত) এবং সূরা আরাফের ১ থেকে ১১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করবেন। সপ্তম পারা এবং অষ্টম পারার প্রথমার্ধজুড়ে বিস্তৃত এই পাঠ্যাংশ জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক ও আল্লাহর অপার কুদরতের প্রতি আলোকপাত করে।

সূরা মায়েদা (৮৩-১২০): সত্যনিষ্ঠদের প্রশংসা ও বিধান

সপ্তম পারার শুরুতে সূরা মায়েদার যে অংশটুকু তিলাওয়াত করা হবে, তাতে সত্যনিষ্ঠ আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) প্রশংসা করা হয়েছে। এরপর ৮৭ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতে মুসলমানদের জন্য কিছু জরুরি বিধান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কসম বা শপথ ভাঙার কাফফারা, যা এই অংশে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। একই সাথে মদ ও জুয়ার মতো নেশা ও ভাগ্য-নির্ভর খেলা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩তম রুকুতে ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং ভুলবশত কেউ শিকার করলে তার কাফফারা কী হবে, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

১০১ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। এছাড়াও, এই অংশে মৃত্যুর সময় অসিয়ত (উইল) এবং সাক্ষী রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো অসিয়ত নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে বা মিথ্যা অভিযোগের আশঙ্কা থাকলে, তা সমাধানের জন্য কসমের আশ্রয় নেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। সূরার শেষাংশে, অর্থাৎ ১০৯ থেকে ১২০ নম্বর আয়াতে, হজরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক ঘটনাবলি এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে কী কথোপকথন করবেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে, যা খ্রিষ্টানদের তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করার প্রেক্ষাপটে আলোচিত।

সূরা আনআম: আল্লাহর অস্তিত্ব ও জীবনবোধের গভীর শিক্ষা

মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আনআম, যা মোট ১৬৫ আয়াত ও ২০ রুকুতে বিভক্ত, এই রাতের তারাবিতে সম্পূর্ণ পাঠ করা হবে। প্রথম চার রুকুতে (১-৪১ আয়াত) কাফেরদের বিভিন্ন প্রশ্ন এবং তাদের হঠকারী আচরণের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা চারপাশের জগতকে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের কার্যকলাপের যৌক্তিকতা বিচার করে।

পঞ্চম থেকে দশম রুকুতে (৪২-৯০ আয়াত) আল্লাহর একত্ববাদ এবং ঈমানের অপরিহার্যতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কাফেরদের মনে জাগা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং পরকালের বিশালতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুমিনদের নসিহত করা হয়েছে। এই অংশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঈমানের পথে আসার ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

১১তম রুকুতে (৯১-৯৪ আয়াত) আসমানী কিতাব নাজিলের প্রয়োজনীয়তা ও এর বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে। ১২তম রুকুতে (৯৫-১১০ আয়াত) আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নিজের পরিচয় দিয়েছেন এবং বিশ্বজগতের পরিচালনায় তাঁর কুদরতের কিছু উদাহরণ দিয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা এরপরও ঈমান আনবে না, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির কথাও বলা হয়েছে।

১৪ ও ১৫তম রুকুতে (১১১-১২৯ আয়াত) অনেক নিদর্শন দেখার পরও যারা ঈমান আনবে না এবং হঠকারী আচরণ করবে, পরকালে তাদের কী ভয়ংকর পরিণতি হবে, তা বর্ণিত হয়েছে। ১৬ ও ১৭তম রুকুতে সাধারণ নসিহতের মাধ্যমে আল্লাহ, কিতাব, নবী ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ১৮ ও ১৯তম রুকুতে (১৩০-১৫৪ আয়াত) উম্মতে মুহাম্মদি ও ইহুদিদের জন্য হারামকৃত খাদ্যবস্তুর একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে এবং ইহুদি ধর্মের বিকৃত রূপের সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

চূড়ান্ত ২০তম রুকুতে (১৫৫-১৬৫ আয়াত) বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে যা হারাম ছিল, কোরআনও তা-ই হারাম করেছে। তাই কোরআনের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার কোনো অজুহাত আর থাকতে পারে না—এই যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সূরা আনআমের সমাপ্তি টানা হয়েছে।

সূরা আরাফ (১-১১): কোরআনের উদ্দেশ্য ও মানব সৃষ্টির প্রেক্ষাপট

মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আরাফের প্রথম রুকুতে (১-১০ আয়াত) কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাজিল হয়েছে এবং যারা আল্লাহর কালাম অমান্য করেছে, তাদের অতীত ইতিহাস ও তাদের ওপর আগত আজাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এই কিতাব মানবে না, তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ১১তম আয়াতে মানব সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায় এবং হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যা আমাদের অস্তিত্বের মূল উৎস সম্পর্কে ধারণা দেয়।

এই রাতের তারাবিতে পঠিত আয়াতগুলো কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলার গুরুত্ব এবং তাঁর অপার সৃষ্টির রহস্য উপলব্ধির এক অমূল্য শিক্ষা বহন করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ: চীন থেকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিসাইল কিনছে ইরান

রমজানের পঞ্চম তারাবি: আল্লাহর বিধান ও জীবনের শিক্ষা

আপডেট সময় : ০৫:১৪:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র রমজান মাসে আজ রোববার অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চম তারাবি। এই রাতে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সূরা মায়েদার ৮৩ থেকে ১২০ নম্বর আয়াত, সূরা আনআম সম্পূর্ণ (১৬৫ আয়াত) এবং সূরা আরাফের ১ থেকে ১১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করবেন। সপ্তম পারা এবং অষ্টম পারার প্রথমার্ধজুড়ে বিস্তৃত এই পাঠ্যাংশ জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক ও আল্লাহর অপার কুদরতের প্রতি আলোকপাত করে।

সূরা মায়েদা (৮৩-১২০): সত্যনিষ্ঠদের প্রশংসা ও বিধান

সপ্তম পারার শুরুতে সূরা মায়েদার যে অংশটুকু তিলাওয়াত করা হবে, তাতে সত্যনিষ্ঠ আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) প্রশংসা করা হয়েছে। এরপর ৮৭ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতে মুসলমানদের জন্য কিছু জরুরি বিধান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কসম বা শপথ ভাঙার কাফফারা, যা এই অংশে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। একই সাথে মদ ও জুয়ার মতো নেশা ও ভাগ্য-নির্ভর খেলা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩তম রুকুতে ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং ভুলবশত কেউ শিকার করলে তার কাফফারা কী হবে, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

১০১ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। এছাড়াও, এই অংশে মৃত্যুর সময় অসিয়ত (উইল) এবং সাক্ষী রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো অসিয়ত নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে বা মিথ্যা অভিযোগের আশঙ্কা থাকলে, তা সমাধানের জন্য কসমের আশ্রয় নেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। সূরার শেষাংশে, অর্থাৎ ১০৯ থেকে ১২০ নম্বর আয়াতে, হজরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক ঘটনাবলি এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে কী কথোপকথন করবেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে, যা খ্রিষ্টানদের তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করার প্রেক্ষাপটে আলোচিত।

সূরা আনআম: আল্লাহর অস্তিত্ব ও জীবনবোধের গভীর শিক্ষা

মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আনআম, যা মোট ১৬৫ আয়াত ও ২০ রুকুতে বিভক্ত, এই রাতের তারাবিতে সম্পূর্ণ পাঠ করা হবে। প্রথম চার রুকুতে (১-৪১ আয়াত) কাফেরদের বিভিন্ন প্রশ্ন এবং তাদের হঠকারী আচরণের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা চারপাশের জগতকে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের কার্যকলাপের যৌক্তিকতা বিচার করে।

পঞ্চম থেকে দশম রুকুতে (৪২-৯০ আয়াত) আল্লাহর একত্ববাদ এবং ঈমানের অপরিহার্যতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কাফেরদের মনে জাগা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং পরকালের বিশালতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুমিনদের নসিহত করা হয়েছে। এই অংশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঈমানের পথে আসার ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

১১তম রুকুতে (৯১-৯৪ আয়াত) আসমানী কিতাব নাজিলের প্রয়োজনীয়তা ও এর বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে। ১২তম রুকুতে (৯৫-১১০ আয়াত) আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নিজের পরিচয় দিয়েছেন এবং বিশ্বজগতের পরিচালনায় তাঁর কুদরতের কিছু উদাহরণ দিয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা এরপরও ঈমান আনবে না, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির কথাও বলা হয়েছে।

১৪ ও ১৫তম রুকুতে (১১১-১২৯ আয়াত) অনেক নিদর্শন দেখার পরও যারা ঈমান আনবে না এবং হঠকারী আচরণ করবে, পরকালে তাদের কী ভয়ংকর পরিণতি হবে, তা বর্ণিত হয়েছে। ১৬ ও ১৭তম রুকুতে সাধারণ নসিহতের মাধ্যমে আল্লাহ, কিতাব, নবী ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ১৮ ও ১৯তম রুকুতে (১৩০-১৫৪ আয়াত) উম্মতে মুহাম্মদি ও ইহুদিদের জন্য হারামকৃত খাদ্যবস্তুর একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে এবং ইহুদি ধর্মের বিকৃত রূপের সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

চূড়ান্ত ২০তম রুকুতে (১৫৫-১৬৫ আয়াত) বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে যা হারাম ছিল, কোরআনও তা-ই হারাম করেছে। তাই কোরআনের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার কোনো অজুহাত আর থাকতে পারে না—এই যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সূরা আনআমের সমাপ্তি টানা হয়েছে।

সূরা আরাফ (১-১১): কোরআনের উদ্দেশ্য ও মানব সৃষ্টির প্রেক্ষাপট

মক্কায় অবতীর্ণ সূরা আরাফের প্রথম রুকুতে (১-১০ আয়াত) কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাজিল হয়েছে এবং যারা আল্লাহর কালাম অমান্য করেছে, তাদের অতীত ইতিহাস ও তাদের ওপর আগত আজাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এই কিতাব মানবে না, তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ১১তম আয়াতে মানব সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায় এবং হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যা আমাদের অস্তিত্বের মূল উৎস সম্পর্কে ধারণা দেয়।

এই রাতের তারাবিতে পঠিত আয়াতগুলো কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলার গুরুত্ব এবং তাঁর অপার সৃষ্টির রহস্য উপলব্ধির এক অমূল্য শিক্ষা বহন করে।