ঢাকা ০২:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

বায়ান্নতে খুলনায় মেয়েদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন মাজেদা আলী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

## শিরোনাম: ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত মাজেদা আলী: খুলনায় নারী মিছিলের অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব

খুলনা: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক গুলিবর্ষণের দুদিন পর, খুলনায় নারী জাগরণের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বেগম মাজেদা আলী। সেই সময়ে সমাজের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের সংগঠিত করে এক ঐতিহাসিক বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এই সাহসিকতার জন্য তাকে কয়েকদিন আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছিল।

আজও ৯০ বছর ছুঁই ছুঁই এই শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও নারী সংগঠক জীবনের পড়ন্ত বেলায় সমাজের আলো হয়ে আছেন। বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে খুলনার কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং নারী নেত্রীরা প্রায়শই তার বাসভবনে সমবেত হন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আড্ডা, স্মৃতিচারণ, গল্প এবং কবিতা পাঠ।

গতকাল শনিবার (২১শে ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে উপলক্ষে নগরীর ফরাজি পাড়ায় তার বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিক বেগম মাজেদা আলীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করা হয়। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ এবং স্মৃতিভ্রংশ তাকে গ্রাস করলেও, নিকটজনেরা মনে করিয়ে দিলে তিনি জীবনের নানা পর্যায় বিস্ময়করভাবে বর্ণনা করেন।

শিক্ষা জীবনে নারীর পথে বাধা ও মাজেদা আলীর সংগ্রাম

বেগম মাজেদা আলী স্মরণ করেন, সে সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া সহজ ছিল না। বাড়িতে বসে পড়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবেশীদের নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। এই কারণে তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেন। ছাত্রীদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাবা আমাকে বিএল কলেজে আইএ-তে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ সেখানে শুধু ছেলেদের পড়ার সুযোগ আছে বলে জানান এবং আমাকে করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা আর কে কলেজে যোগাযোগ করতে বলেন, যেখানে মেয়েরা পড়াশোনা করত।” আর কে কলেজের অধ্যক্ষ অমূল্য ধন সিংহ তাকে ভর্তি করলেও, দৌলতপুর থেকে ট্রেনে করে মাধ্যমিকে ক্লাস করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে, করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিস সুফিয়া বেগম তাকে বিদ্যালয়ের নারী হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কমরেড শচীন বসুর স্ত্রী অনুপমা বসুর সহযোগিতায় তিনি রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান। অনুপমা বসুর হাত ধরেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

ভাষা আন্দোলনের ডামাডোল ও খুলনার নারী মিছিল

১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ড. সানজিদা খাতুন ঢাকা থেকে খুলনায় ছাত্রী সংসদ গঠনের চিঠি পাঠান। ১১ সদস্যের একটি ছাত্রী সংসদ গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বেগম মাজেদা আলী বলেন, “১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে বিদ্যালয় থেকে ফেরার সময় আমি গাজী শহীদুল্লাহ, আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস, মিজানুর রহিম, নুরুল ইসলাম দাদু, মালিক আতাহারসহ কয়েকজন ছাত্রনেতাকে কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তখনো আমি জানতাম না ঢাকায় ২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলি হয়েছে এবং রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্রনেতা ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।” ছাত্রনেতারা তখন তাদের ছাত্রী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করার আহ্বান জানান এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তারা শনিবার করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়, রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়, আর কে কলেজ এবং হামিদ আলী বালিকা বিদ্যালয় বন্ধ রাখারও অনুরোধ করেন।

ছাত্রনেতারা লাঠিসোটা, কাগজ, কালি ও চাটাইয়ের ব্যবস্থা করেন পোস্টার ও ফেস্টুন তৈরির জন্য। সারা রাত জেগে তারা এসব তৈরি করেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই হোস্টেলের বাথরুমের পাশের ছোট গেট দিয়ে ছাত্রীরা বাইরে বের হয়। অন্যান্য বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে অংশ নেয়। শত শত মেয়ে সেদিন মিছিলে যোগ দেয়, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ডা. অতুলেন্দ্র দাসের তিন মেয়ে রত্না, খুকু ও ঝঞ্ঝা, এবং ডা. মাহবুবের স্ত্রী রোকেয়া বেগম শিরী। মিছিলটি করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে নিলা হল (বর্তমান পিকচার প্যালেস হল), থানা, ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে সার্কিট হাউস ঘুরে মহেন্দ্র হীল নারী পার্কে এসে শেষ হয়। এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনে খুলনায় নারীদের প্রথম মিছিল।

আত্মগোপনের দিনগুলো

মিছিলের পরপরই ছাত্রীদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। রোববার সকালে কলেজের অধ্যক্ষ অমূল্য ধন সিংহ তাকে ডেকে পাঠান। ভয়ে ভয়ে অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ করলে তিনি বলেন, “তোমাকে বকাঝকা করতে ডাকিনি। তুমি একটি সাহসী কাজ করেছ। আমি তোমার প্রশংসা করছি। কিন্তু তোমাকে কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে।” বেগম মাজেদা আলী তখন ‘গা-ঢাকা’র অর্থ বুঝতে পারেননি। অধ্যক্ষ পরে বুঝিয়ে বলেন, এর অর্থ হলো তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবেন না, হোস্টেলে বা বাড়িতে থাকতে পারবেন না, এমনকি কলেজেও ক্লাস করতে পারবেন না। কয়েকদিন তাকে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে হবে। অল্প বয়স এবং কোথায় থাকবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত মুন্সিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মময় অধ্যায়

ভাষাসৈনিক বেগম মাজেদা আলী ১৯৩৬ সালের ২৮শে আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম শেখ আব্দুল জব্বার এবং মা মোসাম্মৎ দৌলত উন নেসা। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৫১ সালে করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৩ সালে আর কে কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে বিনা বেতনে সুন্দরবন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে এই কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৩ সালে অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যিনি পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছিলেন। তাদের চার কন্যা সন্তান রয়েছে, যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

বেগম মাজেদা আলী খুলনা মহিলা সমিতি, মহিলা সমবায় সমিতি, দুঃস্থ নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র, বনফুল মহিলা ও শিশু কল্যাণ সমিতি, গার্ল গাইডস সমিতি, লেখিকা সংঘ, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদসহ নারী জাগরণের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তার সাহিত্যকর্ম তাকে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

বায়ান্নতে খুলনায় মেয়েদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন মাজেদা আলী

আপডেট সময় : ০৯:৩৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## শিরোনাম: ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত মাজেদা আলী: খুলনায় নারী মিছিলের অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব

খুলনা: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক গুলিবর্ষণের দুদিন পর, খুলনায় নারী জাগরণের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বেগম মাজেদা আলী। সেই সময়ে সমাজের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের সংগঠিত করে এক ঐতিহাসিক বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এই সাহসিকতার জন্য তাকে কয়েকদিন আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছিল।

আজও ৯০ বছর ছুঁই ছুঁই এই শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও নারী সংগঠক জীবনের পড়ন্ত বেলায় সমাজের আলো হয়ে আছেন। বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে খুলনার কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং নারী নেত্রীরা প্রায়শই তার বাসভবনে সমবেত হন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আড্ডা, স্মৃতিচারণ, গল্প এবং কবিতা পাঠ।

গতকাল শনিবার (২১শে ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে উপলক্ষে নগরীর ফরাজি পাড়ায় তার বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিক বেগম মাজেদা আলীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করা হয়। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ এবং স্মৃতিভ্রংশ তাকে গ্রাস করলেও, নিকটজনেরা মনে করিয়ে দিলে তিনি জীবনের নানা পর্যায় বিস্ময়করভাবে বর্ণনা করেন।

শিক্ষা জীবনে নারীর পথে বাধা ও মাজেদা আলীর সংগ্রাম

বেগম মাজেদা আলী স্মরণ করেন, সে সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া সহজ ছিল না। বাড়িতে বসে পড়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবেশীদের নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। এই কারণে তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেন। ছাত্রীদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাবা আমাকে বিএল কলেজে আইএ-তে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ সেখানে শুধু ছেলেদের পড়ার সুযোগ আছে বলে জানান এবং আমাকে করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা আর কে কলেজে যোগাযোগ করতে বলেন, যেখানে মেয়েরা পড়াশোনা করত।” আর কে কলেজের অধ্যক্ষ অমূল্য ধন সিংহ তাকে ভর্তি করলেও, দৌলতপুর থেকে ট্রেনে করে মাধ্যমিকে ক্লাস করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে, করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিস সুফিয়া বেগম তাকে বিদ্যালয়ের নারী হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কমরেড শচীন বসুর স্ত্রী অনুপমা বসুর সহযোগিতায় তিনি রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান। অনুপমা বসুর হাত ধরেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

ভাষা আন্দোলনের ডামাডোল ও খুলনার নারী মিছিল

১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ড. সানজিদা খাতুন ঢাকা থেকে খুলনায় ছাত্রী সংসদ গঠনের চিঠি পাঠান। ১১ সদস্যের একটি ছাত্রী সংসদ গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বেগম মাজেদা আলী বলেন, “১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে বিদ্যালয় থেকে ফেরার সময় আমি গাজী শহীদুল্লাহ, আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস, মিজানুর রহিম, নুরুল ইসলাম দাদু, মালিক আতাহারসহ কয়েকজন ছাত্রনেতাকে কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তখনো আমি জানতাম না ঢাকায় ২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলি হয়েছে এবং রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্রনেতা ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।” ছাত্রনেতারা তখন তাদের ছাত্রী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করার আহ্বান জানান এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তারা শনিবার করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়, রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়, আর কে কলেজ এবং হামিদ আলী বালিকা বিদ্যালয় বন্ধ রাখারও অনুরোধ করেন।

ছাত্রনেতারা লাঠিসোটা, কাগজ, কালি ও চাটাইয়ের ব্যবস্থা করেন পোস্টার ও ফেস্টুন তৈরির জন্য। সারা রাত জেগে তারা এসব তৈরি করেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই হোস্টেলের বাথরুমের পাশের ছোট গেট দিয়ে ছাত্রীরা বাইরে বের হয়। অন্যান্য বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে অংশ নেয়। শত শত মেয়ে সেদিন মিছিলে যোগ দেয়, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ডা. অতুলেন্দ্র দাসের তিন মেয়ে রত্না, খুকু ও ঝঞ্ঝা, এবং ডা. মাহবুবের স্ত্রী রোকেয়া বেগম শিরী। মিছিলটি করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে নিলা হল (বর্তমান পিকচার প্যালেস হল), থানা, ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে সার্কিট হাউস ঘুরে মহেন্দ্র হীল নারী পার্কে এসে শেষ হয়। এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনে খুলনায় নারীদের প্রথম মিছিল।

আত্মগোপনের দিনগুলো

মিছিলের পরপরই ছাত্রীদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। রোববার সকালে কলেজের অধ্যক্ষ অমূল্য ধন সিংহ তাকে ডেকে পাঠান। ভয়ে ভয়ে অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ করলে তিনি বলেন, “তোমাকে বকাঝকা করতে ডাকিনি। তুমি একটি সাহসী কাজ করেছ। আমি তোমার প্রশংসা করছি। কিন্তু তোমাকে কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে।” বেগম মাজেদা আলী তখন ‘গা-ঢাকা’র অর্থ বুঝতে পারেননি। অধ্যক্ষ পরে বুঝিয়ে বলেন, এর অর্থ হলো তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবেন না, হোস্টেলে বা বাড়িতে থাকতে পারবেন না, এমনকি কলেজেও ক্লাস করতে পারবেন না। কয়েকদিন তাকে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে হবে। অল্প বয়স এবং কোথায় থাকবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত মুন্সিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মময় অধ্যায়

ভাষাসৈনিক বেগম মাজেদা আলী ১৯৩৬ সালের ২৮শে আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম শেখ আব্দুল জব্বার এবং মা মোসাম্মৎ দৌলত উন নেসা। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৫১ সালে করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৩ সালে আর কে কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে বিনা বেতনে সুন্দরবন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে এই কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৩ সালে অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যিনি পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছিলেন। তাদের চার কন্যা সন্তান রয়েছে, যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

বেগম মাজেদা আলী খুলনা মহিলা সমিতি, মহিলা সমবায় সমিতি, দুঃস্থ নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র, বনফুল মহিলা ও শিশু কল্যাণ সমিতি, গার্ল গাইডস সমিতি, লেখিকা সংঘ, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদসহ নারী জাগরণের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তার সাহিত্যকর্ম তাকে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে।