মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০১:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬

গুলিস্তান আন্ডারপাস পথচারীদের নয়, দোকানিদের দখলে: চরম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা সংকট

১৯৯৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে প্রায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল তৎকালীন দেশের অন্যতম আধুনিক এই গুলিস্তান পাতালপথ। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী শহরের ব্যস্ততম সড়কটিতে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা এড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা। শুরুতে ১০ ফুট চওড়া হাঁটার পথের দুই পাশে মোট ১০৪টি ছোট দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও, সময়ের পরিক্রমায় পুরো আন্ডারপাসটি এখন অননুমোদিত বাণিজ্যিক বাজারে রূপ নিয়েছে। দোকানের সীমানা ছাড়িয়ে চলাচলের মূল রাস্তায় রাখা হয়েছে চেয়ার, টেবিল ও মেরামতের দীর্ঘ ডেস্ক। ৮টি প্রধান ফটক বিশিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি এখন হকার, ভাসমান দোকান, ময়লা-আবর্জনা ও ভ্যাপসা গরমে এক দুর্বিষহ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে পথচারীদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে তীব্র ক্ষোভ ও হয়রানির চিত্র। স্বাভাবিক পারাপারের জন্য সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই দোকানিদের টানাটানি, হাঁকডাক ও পথরোধের মুখোমুখি হতে হয় পথচারীদের। পাশাপাশি আলো-বাতাসহীন ঘিঞ্জি এই আন্ডারপাসে ভবঘুরে ও বখাটেদের আনাগোনা বেশি থাকায় নারী পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও নানাবিধ যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু পথচারীই হয়রানি এড়াতে পাতালপথটি সম্পূর্ণ বর্জন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপরের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

আন্ডারপাসটির নাম দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর ‘চোরাই ও ছিনতাই হওয়া ফোনের গোপন আখড়া’ হিসেবেও বহুল চর্চিত। চুরি যাওয়া আইফোন ও অ্যানড্রয়েড সেটের আন্তর্জাতিক আইএমইআই (IMEI) নম্বর আধুনিক সফটওয়্যারের সাহায্যে পরিবর্তন করে পুনরায় বিক্রির একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির পৃথক অভিযানে একাধিকবার অননুমোদিত সফটওয়্যার, ল্যাপটপ ও চোরাই ফোনসহ মূল চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও আন্ডারপাসের এই গোপন অবৈধ কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

আন্ডারপাসটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর চরম ও অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিঝুঁকি। পুরো মার্কেটে বায়ু নিষ্কাশন (ভেন্টিলেশন) বা ধোঁয়া বের হওয়ার কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ভেতরে সেন্ট্রাল এসি পুরোপুরি বিকল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একাধিক জরিপ ও পরিদর্শনে এই পাতালপথটিকে বারবার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তীব্র ধোঁয়া ও উত্তাপ বের হতে না পেরে কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে, তাছাড়া সংকীর্ণ প্রবেশপথের কারণে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে এই সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পেছনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও স্থানীয় মার্কেট সমিতির নীরব যোগসাজশকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনুমোদিত মার্কেট সমিতি না থাকা সত্ত্বেও তোলা হচ্ছে নিয়মিত মাসিক চাদা ও কোটি টাকার তথাকথিত ‘সালামি’। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জনসাধারণের হাঁটার অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদে অবৈধ চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চললেও সিটি করপোরেশন নীরব বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত নজরদারি, এনফোর্সমেন্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবেই আজ জনস্বার্থে নির্মিত এই জাতীয় অবকাঠামোটি পথচারীদের জন্য উপদ্রবে পরিণত হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তরায় র‍্যাবের কথিত ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনালের বিচারক দল, মিলল নির্যাতন কক্ষের আলামত

গুলিস্তান আন্ডারপাস পথচারীদের নয়, দোকানিদের দখলে: চরম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা সংকট

আপডেট সময় : ১১:০১:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

১৯৯৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে প্রায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল তৎকালীন দেশের অন্যতম আধুনিক এই গুলিস্তান পাতালপথ। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী শহরের ব্যস্ততম সড়কটিতে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা এড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা। শুরুতে ১০ ফুট চওড়া হাঁটার পথের দুই পাশে মোট ১০৪টি ছোট দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও, সময়ের পরিক্রমায় পুরো আন্ডারপাসটি এখন অননুমোদিত বাণিজ্যিক বাজারে রূপ নিয়েছে। দোকানের সীমানা ছাড়িয়ে চলাচলের মূল রাস্তায় রাখা হয়েছে চেয়ার, টেবিল ও মেরামতের দীর্ঘ ডেস্ক। ৮টি প্রধান ফটক বিশিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি এখন হকার, ভাসমান দোকান, ময়লা-আবর্জনা ও ভ্যাপসা গরমে এক দুর্বিষহ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে পথচারীদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে তীব্র ক্ষোভ ও হয়রানির চিত্র। স্বাভাবিক পারাপারের জন্য সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই দোকানিদের টানাটানি, হাঁকডাক ও পথরোধের মুখোমুখি হতে হয় পথচারীদের। পাশাপাশি আলো-বাতাসহীন ঘিঞ্জি এই আন্ডারপাসে ভবঘুরে ও বখাটেদের আনাগোনা বেশি থাকায় নারী পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও নানাবিধ যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু পথচারীই হয়রানি এড়াতে পাতালপথটি সম্পূর্ণ বর্জন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপরের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

আন্ডারপাসটির নাম দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর ‘চোরাই ও ছিনতাই হওয়া ফোনের গোপন আখড়া’ হিসেবেও বহুল চর্চিত। চুরি যাওয়া আইফোন ও অ্যানড্রয়েড সেটের আন্তর্জাতিক আইএমইআই (IMEI) নম্বর আধুনিক সফটওয়্যারের সাহায্যে পরিবর্তন করে পুনরায় বিক্রির একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির পৃথক অভিযানে একাধিকবার অননুমোদিত সফটওয়্যার, ল্যাপটপ ও চোরাই ফোনসহ মূল চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও আন্ডারপাসের এই গোপন অবৈধ কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

আন্ডারপাসটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর চরম ও অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিঝুঁকি। পুরো মার্কেটে বায়ু নিষ্কাশন (ভেন্টিলেশন) বা ধোঁয়া বের হওয়ার কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ভেতরে সেন্ট্রাল এসি পুরোপুরি বিকল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একাধিক জরিপ ও পরিদর্শনে এই পাতালপথটিকে বারবার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তীব্র ধোঁয়া ও উত্তাপ বের হতে না পেরে কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে, তাছাড়া সংকীর্ণ প্রবেশপথের কারণে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে এই সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পেছনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও স্থানীয় মার্কেট সমিতির নীরব যোগসাজশকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনুমোদিত মার্কেট সমিতি না থাকা সত্ত্বেও তোলা হচ্ছে নিয়মিত মাসিক চাদা ও কোটি টাকার তথাকথিত ‘সালামি’। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জনসাধারণের হাঁটার অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদে অবৈধ চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চললেও সিটি করপোরেশন নীরব বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত নজরদারি, এনফোর্সমেন্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবেই আজ জনস্বার্থে নির্মিত এই জাতীয় অবকাঠামোটি পথচারীদের জন্য উপদ্রবে পরিণত হয়েছে।