প্রায় দেড় বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রকাশ্যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিকরা। গত শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, নতুন সরকার গঠনের চার দিনের মাথায় এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তাদের তালাবদ্ধ কার্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি জানান। তবে তাদের এই কর্মসূচির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জুলাই রেভলুশনারি জার্নালিস্টস অ্যালায়েন্স (জেআরজেএ)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (আওয়ামী লীগ সমর্থক অংশ) সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গতকাল ভোরে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে জড়ো হন। সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মানববন্ধন করেন। পরে এই নেতৃবৃন্দ একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নামে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শহীদ মিনারের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শ্রদ্ধা জানানোর সারিতে না দাঁড়িয়ে তারা বিচ্ছিন্নভাবে শহীদ বেদীর দিকে গিয়ে জড়ো হন এবং একত্র হয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর দ্রুত সরে পড়েন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাদের কয়েকজন আবারো প্রেস ক্লাবে ফিরে আসেন। এ সময় তারা প্রেস ক্লাবের নিচতলায় অবস্থিত ডিইউজে কার্যালয়ের সামনে এসে স্লোগান দেন। স্লোগান নিয়ে তারা ডিইউজের বন্ধ কার্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি তোলেন। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে তাদের। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (আওয়ামী লীগ সমর্থক অংশ) সাবেক মহাসচিব ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী শাবান মাহমুদ প্রেস ক্লাবের সামনের মানববন্ধনের ছবি পোস্ট দিয়ে এই কর্মসূচিকে ‘আশার আলো’ বলে মন্তব্য করেন।
পরে আওয়ামী লীগ সমর্থক ডিইউজের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তালাবদ্ধ কার্যালয় খোলাসহ ‘বন্দি সাংবাদিকদের’ মুক্তি দাবি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে প্রভাতফেরি সহকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পদযাত্রা করে ডিইউজে। এর আগে সংগঠনটির উদ্যোগে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ডিইউজে সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেনের সঞ্চালনায় এ মানববন্ধনে বক্তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তালাবদ্ধ করা কার্যালয় খোলা এবং ‘মিথ্যা মামলায়’ আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে, তিন শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘হত্যা মামলা’ প্রত্যাহারসহ চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহালের দাবি করা হয়।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ডিইউজের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্য ও কুদ্দুস আফ্রাদ, সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু, অর্থ সম্পাদক সোহেলী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মুজতবা ধ্রুব, আইন সম্পাদক আসাদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস চৌধুরী, নির্বাহী সদস্য সাজেদা হক, রারজানা সুলতানা। এছাড়াও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সহ-সভাপতি আজমল হক হেলাল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ জামাল, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন ইমনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, নতুন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিকদের এমন কর্মসূচির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জুলাই রেভলুশনারি জার্নালিস্টস অ্যালায়েন্স (জেআরজেএ)। সংগঠনটি বলেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছয়জন সাংবাদিকসহ দেড় হাজার ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে, তা আবারও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে সাংবাদিক পরিচয়ে কতিপয় দুর্বৃত্ত। জেআরজেএ-এর সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল ফরাজী বলেন, ‘মুজিববাদী’ স্লোগান দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) প্রেস ক্লাব দখলের অপচেষ্টা করেছে। তিনি দাবি করেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে মুজিববাদের কবর রচিত হয়েছে।’
জেআরজেএ আরও বলেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রাকে দুর্বলতা ভেবে দেশে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো; তার জবাব বাংলাদেশের মাটিতেই দেওয়া হবে। যারা ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে ‘মুজিববাদী’ স্লোগান দিয়েছে এবং একই সঙ্গে পবিত্র শহীদ মিনারে ‘মুজিববাদী’ স্লোগান দিয়ে বেদীতে ফুল দিয়েছে—তাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
জেআরজেএ’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সরকার জুলাইয়ের হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; এই রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার চেষ্টা করলে তার জবাব জুলাইয়ের কোটি কোটি ছাত্র-জনতা দেবে। আজ যারা প্রেস ক্লাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, তাদের অধিকাংশই ‘গণহত্যা মামলার’ আসামি। আমরা দ্রুত এসব অভিযুক্তের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি। এতে আরো বলা হয়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—যারা প্রেস ক্লাবে ‘মুজিববাদী’ স্লোগান দিয়েছে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করুন। একই সঙ্গে দাবি করছি—তাদের মধ্যে যদি কেউ এখনো প্রেস ক্লাবের সদস্য থেকে থাকে, তাদের সদস্যপদ বাতিল করুন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আগের সরকারের পতন হয়। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (আওয়ামী লীগ সমর্থক অংশ) অফিস ভাঙচুর করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এরপর থেকে গত দেড় বছর ধরে কার্যালয়টি তালাবদ্ধ রয়েছে। গত বছরের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকারের এক পদক্ষেপের পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাঝেমধ্যে দু-একটি ‘ঝটিকা মিছিল’ করে পালিয়ে গেলেও নতুন সরকারের সময়ে দলীয় অফিসগুলো খোলার চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের গেটের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
রিপোর্টারের নাম 



















