খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। গত বছর ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সহিংসতার বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে স্থাপিত ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্নার’ ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। এর আগে উপাচার্যের বাসভবন অবরোধ ও তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার মতো ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে কুয়েট ছাত্রকল্যাণ কার্যালয়ের প্রদর্শনী কক্ষে ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছিল। গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের ঘটনা স্মরণ করতে আহত শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে এটি সাজিয়েছিল। এতে সেদিনকার ঘটনার আলোকচিত্র, তদন্ত রিপোর্ট ও বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিং প্রদর্শন করা হয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা কাজ শেষে ফিরে গেলে ১০-১২ জন যুবক সেখানে প্রবেশ করে সবকিছু বিনষ্ট করে চলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী জানান, তারা যখন প্রদর্শনী কক্ষে কাজ করছিলেন, তখনই হামলাকারীদের কয়েকজন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে যায়। এরপর তারা বের হওয়ার পরই ওই যুবকরা কর্নারে প্রবেশ করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টা ৩২ মিনিটে ছাত্রদলের এক নেতার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্নারে’ প্রবেশ করছে এবং ১২টা ৩৭ মিনিটে তারা স্থান ত্যাগ করে। যদিও প্রদর্শনী কক্ষের ভেতরে কোনো ক্যামেরা ছিল না।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট ক্যাম্পাসে ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দুটি অংশের মধ্যে চরম সংঘাতের সৃষ্টি হয়। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির শিকার সিংহভাগ শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগত অস্ত্রধারীদের নিয়ে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। দিনভর চলা সেই সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হন। এ ঘটনার জেরে দুই মাসেরও বেশি সময় কুয়েট বন্ধ ছিল। পরে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ৩৭ জনকে অভিযুক্ত করে ৩২ জনকে সতর্ক এবং ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়।
কুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক প্রফেসর ড. বি এম ইকরামুল হক এ বিষয়ে বলেন, “আমরা কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কুয়েটকে আবারও অশান্ত ও অস্থিতিশীল করতে চাইছে। গত ১৩ তারিখ রাতে যারা উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, রক্তাক্ত কুয়েট কর্নারেও তাদেরকেই প্রবেশ করতে দেখা গেছে। অতীতের মতো ‘গেস্ট রুম কালচার’ আবারও ফিরে আসছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “১৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক আঘাত সৃষ্টি করেছিল। আমরা চেষ্টা করছিলাম সেখান থেকে তাদের বের করে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু আমাদের এই উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমি দপ্তরে একটি মিটিং আহ্বান করেছি এবং সবার পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করব।” সিসিটিভি ফুটেজে কাউকে শনাক্ত করা গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারির সহিংসতার ঘটনায় ছয় মাসের সাজাপ্রাপ্ত ছাত্রদল নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।”
এদিকে, কুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. মাকসুদ হেলালি জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা মৌখিকভাবে একটি কর্মসূচি পালনের কথা তাকে জানিয়েছিলেন। তবে সেখানে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুয়েট ছাত্রদল নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজ তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দপ্তরের প্রদর্শনী কর্নারটি নিজেদের ছবি দিয়ে তারা (আহত শিক্ষার্থীরা) এক বছরের বেশি সময় দখল করে রেখেছে। এটা কুয়েটের সম্পত্তি, ছাত্রশিবিরের সম্পত্তি নয়। কিন্তু শিবির এটাকে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করেছে। তাই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাতে এটা মুক্ত করেছে।” ইফাজ আরও দাবি করেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিবেশ অনেক ভালো এবং শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















