ঢাকা ০২:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতির নৈতিক সংকট ও জাতীয় নির্বাচন: কোন পথে বাংলাদেশ?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০১:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ক্ষোভ ও হতাশা দানা বেঁধেছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সততার কি আদৌ কোনো মূল্য আছে? যখন দেখা যায় আসন্ন নির্বাচনে ঋণখেলাপি, অপরাধী কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরাও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তখন সাধারণ করদাতা ও আইনমান্যকারী নাগরিকদের মনে বঞ্চনার অনুভূতি তীব্রতর হয়। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাষ্ট্রকে কর দেয় এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে, তাদের কাছে এই পরিস্থিতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। রাষ্ট্র যেন আজ সৎ মানুষের পরিবর্তে সুযোগসন্ধানী ও প্রভাবশালীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে।

বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল ব্যাংকের হিসাবের অঙ্ক নয়; বরং এটি শ্রমিক, কৃষক এবং প্রবাসীদের হাড়ভাঙা খাটুনির সঞ্চয়। যখন অর্থ আত্মসাৎকারীরা ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখে, তখন মানুষ অতীতের সেই দুঃসহ স্মৃতিতে ফিরে যায়, যেখানে ক্ষমতাকে সেবার বদলে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যে ব্যক্তি নিজের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করবে—এমন বিশ্বাস করা কঠিন। তাই এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি নৈতিক অগ্নিপরীক্ষা।

আসন্ন এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটি ভোটারের ওপর এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। ভোট এখন কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি বিবেকের সিদ্ধান্ত। কাকে ভোট দেবেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাকে বর্জন করবেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত গণভোট জনগণের সামনে এক বিরল সুযোগ নিয়ে এসেছে। এই ‘হ্যাঁ’ ভোট কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং সংস্কারমুখী রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। এটি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে লুটেরাদের বদলে সৎ ও যোগ্য মানুষেরা মূল্যায়িত হবে।

তবে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই শেরপুরে এক রাজনৈতিক নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ড জাতির বিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এই বর্বরতা আমাদের ২০০৭ সালের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন লগি-বইঠার তাণ্ডবে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। জনগণ কখনোই প্রতিহিংসা ও লাশের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় এমন এক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাজনৈতিক সহিংসতা তখনই ডালপালা মেলে, যখন অপরাধীদের বিচার না করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালন করা হয়। দলের কর্মীদের লাগাম টেনে ধরা নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির পরিচয়।

দেশপ্রেম আজ কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, একে যাপনে ধারণ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা কাদা ছোড়াছুড়ি এবং অন্ধ দলকানা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলেছে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে নেতা কোনো দেবতা নন, বরং তারা জনগণের সেবক। প্রশ্ন করা বা সমালোচনা করা নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা কোনোভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পারে না। ইচ্ছামতো ‘ট্যাগিং’ বা তকমা লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে দমনের সংস্কৃতি একটি দেশকে কেবল স্বৈরতন্ত্রের দিকেই ঠেলে দেয়।

নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, আজ তাদের মধ্যকার চরম বৈরিতা ও সাইবার যুদ্ধ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই বিভেদ ও সংঘাতের পেছনে কোনো দেশি-বিদেশি মহলের ইন্ধন আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজনীতির ময়দান হওয়া উচিত যুক্তি ও নীতির লড়াইয়ের জায়গা, পেশিশক্তির নয়।

পরিশেষে, ব্যক্তি বা দলের চেয়ে দেশ বড়—এই সত্যটি আজ আমাদের অনুধাবন করতে হবে। কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সহাবস্থান ও জাতীয় ঐক্যের পথে হাঁটতে হবে। অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিলেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। দেশ বাঁচলে তবেই আমরা বাঁচব—এই বোধই হোক আগামীর পথচলার পাথেয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান-পাক সীমান্ত সংঘাত: যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান রাশিয়ার, মধ্যস্থতার প্রস্তাবও

রাজনীতির নৈতিক সংকট ও জাতীয় নির্বাচন: কোন পথে বাংলাদেশ?

আপডেট সময় : ১১:০১:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ক্ষোভ ও হতাশা দানা বেঁধেছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সততার কি আদৌ কোনো মূল্য আছে? যখন দেখা যায় আসন্ন নির্বাচনে ঋণখেলাপি, অপরাধী কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরাও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তখন সাধারণ করদাতা ও আইনমান্যকারী নাগরিকদের মনে বঞ্চনার অনুভূতি তীব্রতর হয়। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাষ্ট্রকে কর দেয় এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে, তাদের কাছে এই পরিস্থিতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। রাষ্ট্র যেন আজ সৎ মানুষের পরিবর্তে সুযোগসন্ধানী ও প্রভাবশালীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে।

বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি জনমনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল ব্যাংকের হিসাবের অঙ্ক নয়; বরং এটি শ্রমিক, কৃষক এবং প্রবাসীদের হাড়ভাঙা খাটুনির সঞ্চয়। যখন অর্থ আত্মসাৎকারীরা ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখে, তখন মানুষ অতীতের সেই দুঃসহ স্মৃতিতে ফিরে যায়, যেখানে ক্ষমতাকে সেবার বদলে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যে ব্যক্তি নিজের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করবে—এমন বিশ্বাস করা কঠিন। তাই এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি নৈতিক অগ্নিপরীক্ষা।

আসন্ন এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটি ভোটারের ওপর এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। ভোট এখন কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি বিবেকের সিদ্ধান্ত। কাকে ভোট দেবেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাকে বর্জন করবেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত গণভোট জনগণের সামনে এক বিরল সুযোগ নিয়ে এসেছে। এই ‘হ্যাঁ’ ভোট কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং সংস্কারমুখী রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। এটি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে লুটেরাদের বদলে সৎ ও যোগ্য মানুষেরা মূল্যায়িত হবে।

তবে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই শেরপুরে এক রাজনৈতিক নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ড জাতির বিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এই বর্বরতা আমাদের ২০০৭ সালের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন লগি-বইঠার তাণ্ডবে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। জনগণ কখনোই প্রতিহিংসা ও লাশের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় এমন এক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাজনৈতিক সহিংসতা তখনই ডালপালা মেলে, যখন অপরাধীদের বিচার না করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালন করা হয়। দলের কর্মীদের লাগাম টেনে ধরা নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির পরিচয়।

দেশপ্রেম আজ কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, একে যাপনে ধারণ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা কাদা ছোড়াছুড়ি এবং অন্ধ দলকানা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলেছে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে নেতা কোনো দেবতা নন, বরং তারা জনগণের সেবক। প্রশ্ন করা বা সমালোচনা করা নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা কোনোভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পারে না। ইচ্ছামতো ‘ট্যাগিং’ বা তকমা লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে দমনের সংস্কৃতি একটি দেশকে কেবল স্বৈরতন্ত্রের দিকেই ঠেলে দেয়।

নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, আজ তাদের মধ্যকার চরম বৈরিতা ও সাইবার যুদ্ধ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই বিভেদ ও সংঘাতের পেছনে কোনো দেশি-বিদেশি মহলের ইন্ধন আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজনীতির ময়দান হওয়া উচিত যুক্তি ও নীতির লড়াইয়ের জায়গা, পেশিশক্তির নয়।

পরিশেষে, ব্যক্তি বা দলের চেয়ে দেশ বড়—এই সত্যটি আজ আমাদের অনুধাবন করতে হবে। কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সহাবস্থান ও জাতীয় ঐক্যের পথে হাঁটতে হবে। অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিলেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। দেশ বাঁচলে তবেই আমরা বাঁচব—এই বোধই হোক আগামীর পথচলার পাথেয়।