ঢাকা ০২:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনি প্রচারে ‘বাক্যবাণ’ ছুড়ুন, ‘গুলি’ নয়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৭:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

নির্বাচনী ময়দানে কথার লড়াই: সংঘাত নয়, যুক্তির জয় চাই

ঢাকা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই শেষ মুহূর্তে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। প্রধান দুই জোট, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রচারণা শেষ করে এখন রাজধানী ঢাকায় মনোনিবেশ করছে। পাশাপাশি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোও নিজ নিজ সাধ্যমতো নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও, ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন পার্টি (এনসিপি) প্রধান নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের মতো নেতাদের নির্বাচনী প্রচারও গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রচারণার শুরুতেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়:

গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই প্রধান দলগুলোর মধ্যে বাক্যবাণ ছুড়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক সমাবেশে সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে ‘মিথ্যাচার’, ‘মানুষকে ঠকানো’ এবং ‘শিরক’ করার মতো অভিযোগ আনেন। এমনকি, তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

অন্যদিকে, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান মিরপুর-১০ এর এক সমাবেশে বিএনপিকে ‘ভোট ডাকাত’ আখ্যায়িত করে বলেন, “১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান না।” তিনি আরও বলেন, “আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদেরও একই পরিণতি হবে।” বিগত তিনটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান?” তিনি চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যা—এসব থেকে যারা নিজেদের কর্মীদের বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন নাকি কৌশল?

বিএনপি ও জামায়াতের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেশের দীর্ঘদিনের বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, বাংলাদেশে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে হেয় করা, দোষারোপ করা এবং হেনস্তা করার মতো ভাষা ব্যবহার করা হয়। দলগুলো মনে করে, অন্যকে নীচু করার মধ্য দিয়ে জয় নিশ্চিত করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ এই ধারাকে ‘দোষারোপের রাজনীতি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “রাজনীতির খেলাটাই হলো শত্রু-মিত্র খেলা। এখানে আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল না করতে পারলে আপনি দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হবেন।” তবে তিনি জোর দেন যে, এই প্রচারণাকে কেন্দ্র করে যেন কোনো সহিংসতা না ঘটে, কারণ তা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে দেবে।

ভিন্নমত প্রকাশের স্বাভাবিক ধারা নাকি সংকীর্ণতা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দুই দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে তাদের ‘রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা তুলে ধরতে তারা এই বিষয়গুলোকে সামনে আনবে। তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, এ নিয়ে যেন কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি না হয়।

গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা বিভিন্ন ধরনের শব্দচয়ন এবং তির্যক বাক্যবাণের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। তবে, এই বাক্যবাণ যেন ব্যক্তিগত চরিত্র হননের পর্যায়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতি বিরোধ থেকেই শুরু হয় এবং সমাজের সদস্যদের মধ্যে পার্থক্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটে। এই পার্থক্য থেকেই দলগুলোর বক্তৃতা-বিবৃতিতে পার্থক্য থাকবে এবং একে-অন্যের প্রতি তির্যক বাক্যবাণ ছুড়বেÑএটাই স্বাভাবিক। তবে, এই দোষারোপ এবং বাক্যবাণ যেন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে এবং কোনোভাবেই সংঘাতে রূপান্তর না ঘটে, সেদিকে সকল প্রার্থীকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনমত গঠন, ঘৃণা বা সংঘাত সৃষ্টি নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান-পাক সীমান্ত সংঘাত: যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান রাশিয়ার, মধ্যস্থতার প্রস্তাবও

নির্বাচনি প্রচারে ‘বাক্যবাণ’ ছুড়ুন, ‘গুলি’ নয়

আপডেট সময় : ১০:৩৭:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনী ময়দানে কথার লড়াই: সংঘাত নয়, যুক্তির জয় চাই

ঢাকা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই শেষ মুহূর্তে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। প্রধান দুই জোট, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রচারণা শেষ করে এখন রাজধানী ঢাকায় মনোনিবেশ করছে। পাশাপাশি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোও নিজ নিজ সাধ্যমতো নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও, ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন পার্টি (এনসিপি) প্রধান নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের মতো নেতাদের নির্বাচনী প্রচারও গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রচারণার শুরুতেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়:

গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই প্রধান দলগুলোর মধ্যে বাক্যবাণ ছুড়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক সমাবেশে সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে ‘মিথ্যাচার’, ‘মানুষকে ঠকানো’ এবং ‘শিরক’ করার মতো অভিযোগ আনেন। এমনকি, তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

অন্যদিকে, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান মিরপুর-১০ এর এক সমাবেশে বিএনপিকে ‘ভোট ডাকাত’ আখ্যায়িত করে বলেন, “১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান না।” তিনি আরও বলেন, “আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদেরও একই পরিণতি হবে।” বিগত তিনটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান?” তিনি চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যা—এসব থেকে যারা নিজেদের কর্মীদের বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন নাকি কৌশল?

বিএনপি ও জামায়াতের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেশের দীর্ঘদিনের বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, বাংলাদেশে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে হেয় করা, দোষারোপ করা এবং হেনস্তা করার মতো ভাষা ব্যবহার করা হয়। দলগুলো মনে করে, অন্যকে নীচু করার মধ্য দিয়ে জয় নিশ্চিত করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ এই ধারাকে ‘দোষারোপের রাজনীতি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “রাজনীতির খেলাটাই হলো শত্রু-মিত্র খেলা। এখানে আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল না করতে পারলে আপনি দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হবেন।” তবে তিনি জোর দেন যে, এই প্রচারণাকে কেন্দ্র করে যেন কোনো সহিংসতা না ঘটে, কারণ তা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে দেবে।

ভিন্নমত প্রকাশের স্বাভাবিক ধারা নাকি সংকীর্ণতা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দুই দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে তাদের ‘রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা তুলে ধরতে তারা এই বিষয়গুলোকে সামনে আনবে। তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, এ নিয়ে যেন কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি না হয়।

গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা বিভিন্ন ধরনের শব্দচয়ন এবং তির্যক বাক্যবাণের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। তবে, এই বাক্যবাণ যেন ব্যক্তিগত চরিত্র হননের পর্যায়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতি বিরোধ থেকেই শুরু হয় এবং সমাজের সদস্যদের মধ্যে পার্থক্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটে। এই পার্থক্য থেকেই দলগুলোর বক্তৃতা-বিবৃতিতে পার্থক্য থাকবে এবং একে-অন্যের প্রতি তির্যক বাক্যবাণ ছুড়বেÑএটাই স্বাভাবিক। তবে, এই দোষারোপ এবং বাক্যবাণ যেন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে এবং কোনোভাবেই সংঘাতে রূপান্তর না ঘটে, সেদিকে সকল প্রার্থীকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনমত গঠন, ঘৃণা বা সংঘাত সৃষ্টি নয়।