ঢাকা ০২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ নীতি বদলাতে হবে ভারতকে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫১:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

## বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে নতুন সমীকরণের পথে

ঢাকা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকৃত্রিম সমর্থন ও সামরিক সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যে সামরিক সক্ষমতার প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো এককভাবে সম্ভব ছিল না। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তবে, এই ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপকে কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ভারতকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে বিভক্ত করার, নিজস্ব পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে সুরক্ষিত করার এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার ভারসাম্যকে চূড়ান্তভাবে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার এক বিরল কৌশলগত সুযোগও করে দিয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক সত্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ভারতীয় নীতিনির্ধারক মহল প্রায়শই এই ঐতিহাসিক সমর্থনকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার একটি ন্যায্য কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অনিবার্যও। এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশের মূল সমস্যা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রতি নয়াদিল্লির কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের ধারণা।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে এমন একটি মডেলে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে, যা অনেকটা ভুটান-সম মডেলের সঙ্গে তুলনীয়। নয়াদিল্লি ভুটানকে তার পররাষ্ট্রনীতিতে সীমিত স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছে এবং ভারতীয় কৌশলগত পছন্দের প্রতি এক অনানুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বাধ্য করেছে। এই পদ্ধতি ভুটানের মতো একটি ছোট দেশের জন্য কার্যকর হতে পারে, যার বৈশ্বিক যোগাযোগ সীমিত এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি সংকীর্ণ। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা প্রায়শই এই বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, ভুটানের এই মডেল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশ ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো ছোট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয় নয়। ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল দেশ। এটি একটি বৃহৎ, বিশ্বব্যাপী সমন্বিত অর্থনীতির অধিকারী এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও তার বাইরেও সংযোগ স্থাপন করছে। বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাব এবং বিশ্বাসযোগ্য কৌশলগত বিকল্প রয়েছে। এই মাত্রার একটি দেশের ওপর ভুটানের মতো মডেল চাপিয়ে দেওয়ার ভারতের প্রচেষ্টা স্পষ্টতই একটি কৌশলগত ত্রুটি, যা প্রভাব বিস্তারের পরিবর্তে বিরক্তি সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের ওপর ভারতের সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা আস্থা হ্রাস করছে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে।

দলীয় জোটবদ্ধতার মূল্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ:

শেখ হাসিনার গত পনেরো বছরের শাসনামলে তার সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন কেবল স্বাভাবিক কূটনৈতিক অনুশীলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল। সময়ের সাথে সাথে দিল্লিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক সমর্থন, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছে। এমনকি হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচনি কারচুপি এবং দমন-পীড়নের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারতের এই সমর্থন অব্যাহত ছিল।

ভারতের এই আচরণ বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক বাংলাদেশি ভারতকে অংশীদার হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। কারণ, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজারে প্রবেশাধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও সংযোগ করিডোরসহ নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের জন্য ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল বাংলাদেশ বিষয়ক ভারতীয় গণমাধ্যমে তৈরি হওয়া বয়ান এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। এর মাধ্যমে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতিকে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে যে বাংলাদেশের মানুষ এই গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তাদের সেই জনপ্রিয় আকাঙ্ক্ষাকেও অবমূল্যায়ন করা হয়। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সদস্যদের আতিথেয়তা দেওয়ার ভারতের সিদ্ধান্ত এই ধারণাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচারের জন্য হাসিনার ভারতীয় ভূখণ্ডকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার বাংলাদেশে উদ্বেগের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়াদিল্লির এই ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা দিল্লি হয়তো ততটা স্বীকার করতে ইচ্ছুক নয়, কিন্তু বাস্তবে ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে।

নির্বাচনি পুনর্বিন্যাস ও সম্পর্কের পুনর্গঠনের সুযোগ:

বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের জন্য ভারতের সামনে একটি প্রকৃত সুযোগ এনে দিতে পারে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বর্তমানে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে, যার ফলে দলটি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে নির্বাচনি ক্ষেত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি ইসলামপন্থী জোট বিএনপির সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদাররা, বিশেষ করে ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করা যুবকদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), এই জোটের একটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ভিত্তি এবং নির্বাচনি প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিগত দেড় দশকে ভারত ছিল হাসিনার প্রধান সমর্থক। এই সময়ের বেশিরভাগ সময়ে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি। কিন্তু নয়াদিল্লি সম্প্রতি বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে, পরবর্তী সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এমন দলটির সঙ্গে যোগাযোগের পথ পুনর্নির্মাণে আগ্রহী নয়াদিল্লি। তবে, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে তাদের সরকার জামায়াত-এনসিপি জোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী ব্লকের অব্যাহত চাপের সম্মুখীন হবে। কারণ, এই জোট ভারতের প্রতি অতিরিক্ত সহনশীল বলে বিবেচিত যেকোনো নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত।

বাংলাদেশের নির্বাচনে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত যদি সেই রাজনৈতিক ফল মেনে নেয়, তাহলেই নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন বিশ্বাসযোগ্য হবে। ভারতকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো বন্ধ করতে হবে। হাসিনা বা তার সহযোগীদের ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর অনুমতি দেওয়া দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রকে দুর্বল করবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য অর্থবহ সব সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং, সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য নিরপেক্ষতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা প্রদর্শন অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

আসিয়ান-ধাঁচের দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা:

ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে টেকসই সম্পর্কের পুনর্গঠন চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই এমন একটি মডেল বেছে নিতে হবে, যা বাংলাদেশকে একটি অধস্তন স্থানের পরিবর্তে একটি সার্বভৌম ও সমমর্যাদার দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই মডেলের একটি কার্যকর রেফারেন্স পয়েন্ট হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের ব্যবহারিক আদর্শ, যার সহযোগিতার মূল শর্ত হলো সংগঠনভুক্ত কোনো দেশে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ না করা।

বাংলাদেশ-ভারত বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আসিয়ান-ধাঁচের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের মাধ্যমেই ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ার একটি পথ তৈরি করতে পারে। ভারতকে এটি শুরু করতে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার বা নিরপেক্ষ থাকার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সম্পর্কের এ ধরনের পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ভারতের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে তার জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে বৈচিত্র্যময় বহিরাগত অংশীদারত্ব অনুসরণ করবে। অতএব, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বহির্মুখী শক্তির সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ততাকে ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জোট গঠন হিসেবে দেখা উচিত হবে না। ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে তাদের স্বার্থ স্বাভাবিকভাবেই একই ধরনের। বিশেষ করে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা বলা যায়।

একই সঙ্গে, আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টনের অমীমাংসিত সমস্যা, বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ইস্যু বাংলাদেশে একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরে বহু বছর ধরে ভারত অনীহা দেখিয়ে আসছে। ফলে এই বিষয়টিকে বাংলাদেশে এভাবেই দেখা হচ্ছে যে, নয়াদিল্লি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বা এর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে সমান অংশীদার বিবেচনা করতে অনীহা দেখাচ্ছে।

ভারত কীভাবে এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করবে, তার স্পষ্ট পরীক্ষা হবে এর মাধ্যমে যে, তারা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক। একই সঙ্গে, অর্থপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগিতা এই দ্বিপক্ষীয় ভিত্তির শক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে দুই দেশের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, টেকসই সহযোগিতা, সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর নির্ভরশীল। ভারত কি পদক্ষেপ নেবে, তার ওপরই এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সংঘাত চাইবে না, তবে তারা তার সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত পছন্দের প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা আশা করবে। অতএব, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন তখনই সম্ভব হবে, যখন ভারত বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে মেনে নেবে এবং বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান-পাক সীমান্ত সংঘাত: যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান রাশিয়ার, মধ্যস্থতার প্রস্তাবও

বাংলাদেশ নীতি বদলাতে হবে ভারতকে

আপডেট সময় : ০৯:৫১:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে নতুন সমীকরণের পথে

ঢাকা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকৃত্রিম সমর্থন ও সামরিক সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যে সামরিক সক্ষমতার প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো এককভাবে সম্ভব ছিল না। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তবে, এই ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপকে কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ভারতকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে বিভক্ত করার, নিজস্ব পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে সুরক্ষিত করার এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার ভারসাম্যকে চূড়ান্তভাবে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার এক বিরল কৌশলগত সুযোগও করে দিয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক সত্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ভারতীয় নীতিনির্ধারক মহল প্রায়শই এই ঐতিহাসিক সমর্থনকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার একটি ন্যায্য কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অনিবার্যও। এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশের মূল সমস্যা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রতি নয়াদিল্লির কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের ধারণা।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে এমন একটি মডেলে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে, যা অনেকটা ভুটান-সম মডেলের সঙ্গে তুলনীয়। নয়াদিল্লি ভুটানকে তার পররাষ্ট্রনীতিতে সীমিত স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছে এবং ভারতীয় কৌশলগত পছন্দের প্রতি এক অনানুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বাধ্য করেছে। এই পদ্ধতি ভুটানের মতো একটি ছোট দেশের জন্য কার্যকর হতে পারে, যার বৈশ্বিক যোগাযোগ সীমিত এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি সংকীর্ণ। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা প্রায়শই এই বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, ভুটানের এই মডেল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশ ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো ছোট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয় নয়। ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল দেশ। এটি একটি বৃহৎ, বিশ্বব্যাপী সমন্বিত অর্থনীতির অধিকারী এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও তার বাইরেও সংযোগ স্থাপন করছে। বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাব এবং বিশ্বাসযোগ্য কৌশলগত বিকল্প রয়েছে। এই মাত্রার একটি দেশের ওপর ভুটানের মতো মডেল চাপিয়ে দেওয়ার ভারতের প্রচেষ্টা স্পষ্টতই একটি কৌশলগত ত্রুটি, যা প্রভাব বিস্তারের পরিবর্তে বিরক্তি সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের ওপর ভারতের সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা আস্থা হ্রাস করছে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে।

দলীয় জোটবদ্ধতার মূল্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ:

শেখ হাসিনার গত পনেরো বছরের শাসনামলে তার সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন কেবল স্বাভাবিক কূটনৈতিক অনুশীলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল। সময়ের সাথে সাথে দিল্লিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক সমর্থন, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছে। এমনকি হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচনি কারচুপি এবং দমন-পীড়নের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারতের এই সমর্থন অব্যাহত ছিল।

ভারতের এই আচরণ বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক বাংলাদেশি ভারতকে অংশীদার হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। কারণ, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজারে প্রবেশাধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও সংযোগ করিডোরসহ নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের জন্য ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল বাংলাদেশ বিষয়ক ভারতীয় গণমাধ্যমে তৈরি হওয়া বয়ান এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। এর মাধ্যমে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতিকে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে যে বাংলাদেশের মানুষ এই গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তাদের সেই জনপ্রিয় আকাঙ্ক্ষাকেও অবমূল্যায়ন করা হয়। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সদস্যদের আতিথেয়তা দেওয়ার ভারতের সিদ্ধান্ত এই ধারণাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচারের জন্য হাসিনার ভারতীয় ভূখণ্ডকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার বাংলাদেশে উদ্বেগের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়াদিল্লির এই ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা দিল্লি হয়তো ততটা স্বীকার করতে ইচ্ছুক নয়, কিন্তু বাস্তবে ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে।

নির্বাচনি পুনর্বিন্যাস ও সম্পর্কের পুনর্গঠনের সুযোগ:

বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের জন্য ভারতের সামনে একটি প্রকৃত সুযোগ এনে দিতে পারে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বর্তমানে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে, যার ফলে দলটি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে নির্বাচনি ক্ষেত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি ইসলামপন্থী জোট বিএনপির সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদাররা, বিশেষ করে ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করা যুবকদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), এই জোটের একটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ভিত্তি এবং নির্বাচনি প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিগত দেড় দশকে ভারত ছিল হাসিনার প্রধান সমর্থক। এই সময়ের বেশিরভাগ সময়ে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিএনপি। কিন্তু নয়াদিল্লি সম্প্রতি বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে, পরবর্তী সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এমন দলটির সঙ্গে যোগাযোগের পথ পুনর্নির্মাণে আগ্রহী নয়াদিল্লি। তবে, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে তাদের সরকার জামায়াত-এনসিপি জোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী ব্লকের অব্যাহত চাপের সম্মুখীন হবে। কারণ, এই জোট ভারতের প্রতি অতিরিক্ত সহনশীল বলে বিবেচিত যেকোনো নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত।

বাংলাদেশের নির্বাচনে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত যদি সেই রাজনৈতিক ফল মেনে নেয়, তাহলেই নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্গঠন বিশ্বাসযোগ্য হবে। ভারতকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো বন্ধ করতে হবে। হাসিনা বা তার সহযোগীদের ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর অনুমতি দেওয়া দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রকে দুর্বল করবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য অর্থবহ সব সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং, সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য নিরপেক্ষতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা প্রদর্শন অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

আসিয়ান-ধাঁচের দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা:

ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে টেকসই সম্পর্কের পুনর্গঠন চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই এমন একটি মডেল বেছে নিতে হবে, যা বাংলাদেশকে একটি অধস্তন স্থানের পরিবর্তে একটি সার্বভৌম ও সমমর্যাদার দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই মডেলের একটি কার্যকর রেফারেন্স পয়েন্ট হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের ব্যবহারিক আদর্শ, যার সহযোগিতার মূল শর্ত হলো সংগঠনভুক্ত কোনো দেশে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ না করা।

বাংলাদেশ-ভারত বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আসিয়ান-ধাঁচের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের মাধ্যমেই ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ার একটি পথ তৈরি করতে পারে। ভারতকে এটি শুরু করতে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার বা নিরপেক্ষ থাকার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সম্পর্কের এ ধরনের পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ভারতের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে তার জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে বৈচিত্র্যময় বহিরাগত অংশীদারত্ব অনুসরণ করবে। অতএব, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বহির্মুখী শক্তির সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ততাকে ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জোট গঠন হিসেবে দেখা উচিত হবে না। ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে তাদের স্বার্থ স্বাভাবিকভাবেই একই ধরনের। বিশেষ করে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা বলা যায়।

একই সঙ্গে, আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টনের অমীমাংসিত সমস্যা, বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ইস্যু বাংলাদেশে একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরে বহু বছর ধরে ভারত অনীহা দেখিয়ে আসছে। ফলে এই বিষয়টিকে বাংলাদেশে এভাবেই দেখা হচ্ছে যে, নয়াদিল্লি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বা এর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে সমান অংশীদার বিবেচনা করতে অনীহা দেখাচ্ছে।

ভারত কীভাবে এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করবে, তার স্পষ্ট পরীক্ষা হবে এর মাধ্যমে যে, তারা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক। একই সঙ্গে, অর্থপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগিতা এই দ্বিপক্ষীয় ভিত্তির শক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে দুই দেশের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, টেকসই সহযোগিতা, সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর নির্ভরশীল। ভারত কি পদক্ষেপ নেবে, তার ওপরই এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সংঘাত চাইবে না, তবে তারা তার সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত পছন্দের প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা আশা করবে। অতএব, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন তখনই সম্ভব হবে, যখন ভারত বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে মেনে নেবে এবং বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী