ঢাকা ০২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি: ড. ইউনূসের অগ্নিপরীক্ষা, ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

দেখতে দেখতে চলে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন। বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর দেশে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের এই নির্বাচনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের সেরা’ ও ‘মাইলফলক’ নির্বাচন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি, তাঁর নিজের জন্যও এক বড় ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) সহ ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক বিশাল অংশগ্রহণ। মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর শেষ হয়েছে দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িতে যাদের ভোট, তারা রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। প্রার্থীরাও শেষ মুহূর্তের প্রচারে ছিলেন ভীষণ ব্যস্ত। নির্বাচন বানচাল করার কিছু অপচেষ্টা হলেও, সরকারের কঠোর অবস্থান, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অবস্থানের কারণে সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখন নির্বাচন ঠেকানো যাবে না, তা শতভাগ নিশ্চিত।

ড. ইউনূসের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৯১ সালের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকে সবচেয়ে সেরা ও নিরপেক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ড. ইউনূস তাঁর শাসনামলের এই নির্বাচনকে সেই মডেলকেও ছাড়িয়ে ‘ইতিহাসের সেরা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসনের পতনের পর এটিই প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ড. ইউনূস যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারেন, তবে তা তাঁর জন্য এক বড় সফলতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর দেড় বছরের শাসনকালকে দেখা হচ্ছে একটি ‘উত্তরণকালীন সময়’ হিসেবে, যেখানে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বৈরাচারী কাঠামো থেকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ব দরবারে তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে এবং এই নির্বাচন সফল হলে তা আরও সুদৃঢ় হবে।

কেন এই নির্বাচন অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘মাইলফলক’ ও ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এটি কয়েকটি কারণে অনন্য:

ব্যাপক অংশগ্রহণ: পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসহ ৫১টি দলের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
গণভোট ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই পর্বে ১০ বছরের বেশি না হওয়া এবং সংসদের উচ্চকক্ষ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে প্রতি সপ্তাহে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব (পিএমকিউএস) চালু হওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রবাসী ভোটাধিকার: প্রথমবারের মতো ৬ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি ডাকযোগের মাধ্যমে (পোস্টাল ব্যালট) তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা: নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সম্পূর্ণ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং মুক্ত’ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা: নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশজুড়ে এক লাখ সেনাসদস্যসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জানিয়েছেন, এই নির্বাচন শতভাগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে এবং সেনাবাহিনী কোনো দলের পক্ষ নেবে না। সেনা কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনি ব্যবস্থা: ভোটারদের অভিজ্ঞতা সহজ ও স্বচ্ছ করতে ইসির নতুন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বৃদ্ধি (সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০), ৪৫ হাজার ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখ ৮ হাজার ভোটকক্ষ স্থাপন।
সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা: প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং এক হাজারেরও বেশি ড্রোন দিয়ে দেশব্যাপী নজরদারি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা (যেমন এএনএফআরইএল) এবং দেশি পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ নাগরিক মনে করেন তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন নিবন্ধিত দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করছে।

বিএনপি: এই নির্বাচনকে ‘দেশ পুনর্গঠনের নির্বাচন’ এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবে দেখছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এটিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং দীর্ঘদিনের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিএনপি বিজয়ী হলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো জোট বা জাতীয় সরকারে যাবে না; বরং জামায়াত শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন তারেক রহমান।
জামায়াতে ইসলামী: এই নির্বাচনকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ হিসেবে দেখছে। তারা একটি ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, এই ভোট হবে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে নেওয়ার ভোট।
অন্যান্য দল: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন দলগুলো ছাত্র আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

ড. ইউনূসের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ড
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনমতের প্রতিফলন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বা সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তাঁর সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলো জনসমর্থন পাচ্ছে কি না। প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে বিশৃঙ্খলা ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন করা সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।

ড. ইউনূস ঘোষিত ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন হতে হলে তা ১৯৯১ সালের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে নির্বাচনের চেয়েও ভালো হতে হবে। এতে উৎসবমুখর পরিবেশ, ৭০ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতি, তরুণ প্রজন্মের শতভাগ অংশগ্রহণ এবং মানুষ ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে ড. ইউনূস এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন এবং তা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান-পাক সীমান্ত সংঘাত: যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান রাশিয়ার, মধ্যস্থতার প্রস্তাবও

১২ ফেব্রুয়ারি: ড. ইউনূসের অগ্নিপরীক্ষা, ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৯:২৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেখতে দেখতে চলে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন। বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর দেশে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের এই নির্বাচনকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের সেরা’ ও ‘মাইলফলক’ নির্বাচন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি, তাঁর নিজের জন্যও এক বড় ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) সহ ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক বিশাল অংশগ্রহণ। মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর শেষ হয়েছে দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িতে যাদের ভোট, তারা রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। প্রার্থীরাও শেষ মুহূর্তের প্রচারে ছিলেন ভীষণ ব্যস্ত। নির্বাচন বানচাল করার কিছু অপচেষ্টা হলেও, সরকারের কঠোর অবস্থান, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অবস্থানের কারণে সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখন নির্বাচন ঠেকানো যাবে না, তা শতভাগ নিশ্চিত।

ড. ইউনূসের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৯১ সালের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকে সবচেয়ে সেরা ও নিরপেক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ড. ইউনূস তাঁর শাসনামলের এই নির্বাচনকে সেই মডেলকেও ছাড়িয়ে ‘ইতিহাসের সেরা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসনের পতনের পর এটিই প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ড. ইউনূস যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারেন, তবে তা তাঁর জন্য এক বড় সফলতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর দেড় বছরের শাসনকালকে দেখা হচ্ছে একটি ‘উত্তরণকালীন সময়’ হিসেবে, যেখানে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বৈরাচারী কাঠামো থেকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ব দরবারে তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে এবং এই নির্বাচন সফল হলে তা আরও সুদৃঢ় হবে।

কেন এই নির্বাচন অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘মাইলফলক’ ও ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এটি কয়েকটি কারণে অনন্য:

ব্যাপক অংশগ্রহণ: পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসহ ৫১টি দলের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
গণভোট ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই পর্বে ১০ বছরের বেশি না হওয়া এবং সংসদের উচ্চকক্ষ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে প্রতি সপ্তাহে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব (পিএমকিউএস) চালু হওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রবাসী ভোটাধিকার: প্রথমবারের মতো ৬ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি ডাকযোগের মাধ্যমে (পোস্টাল ব্যালট) তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা: নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সম্পূর্ণ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং মুক্ত’ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা: নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশজুড়ে এক লাখ সেনাসদস্যসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জানিয়েছেন, এই নির্বাচন শতভাগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে এবং সেনাবাহিনী কোনো দলের পক্ষ নেবে না। সেনা কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনি ব্যবস্থা: ভোটারদের অভিজ্ঞতা সহজ ও স্বচ্ছ করতে ইসির নতুন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বৃদ্ধি (সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০), ৪৫ হাজার ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখ ৮ হাজার ভোটকক্ষ স্থাপন।
সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা: প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং এক হাজারেরও বেশি ড্রোন দিয়ে দেশব্যাপী নজরদারি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা (যেমন এএনএফআরইএল) এবং দেশি পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ নাগরিক মনে করেন তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন নিবন্ধিত দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করছে।

বিএনপি: এই নির্বাচনকে ‘দেশ পুনর্গঠনের নির্বাচন’ এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবে দেখছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এটিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং দীর্ঘদিনের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিএনপি বিজয়ী হলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো জোট বা জাতীয় সরকারে যাবে না; বরং জামায়াত শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন তারেক রহমান।
জামায়াতে ইসলামী: এই নির্বাচনকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ হিসেবে দেখছে। তারা একটি ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, এই ভোট হবে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে নেওয়ার ভোট।
অন্যান্য দল: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন দলগুলো ছাত্র আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

ড. ইউনূসের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ড
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনমতের প্রতিফলন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বা সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তাঁর সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলো জনসমর্থন পাচ্ছে কি না। প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে বিশৃঙ্খলা ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন করা সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।

ড. ইউনূস ঘোষিত ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন হতে হলে তা ১৯৯১ সালের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে নির্বাচনের চেয়েও ভালো হতে হবে। এতে উৎসবমুখর পরিবেশ, ৭০ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতি, তরুণ প্রজন্মের শতভাগ অংশগ্রহণ এবং মানুষ ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে ড. ইউনূস এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন এবং তা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।