যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এক নতুন সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এবং নৌশক্তির প্রদর্শন যুদ্ধের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলেছে, যা কেবল ইরানকেই নয়, সমগ্র অঞ্চলকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই সম্ভাব্য সংঘাতের সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিককালে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে অপসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এর পরপরই, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা থাড এবং প্যাট্রিয়ট সহ বিপুল সংখ্যক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে। ট্রাম্প প্রশাসন আরও হুমকি দেয় যে, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে পরবর্তী মার্কিন আক্রমণ বর্তমানের চেয়েও অনেক বেশি বিধ্বংসী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি হলো, ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে হবে। তবে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি স্পষ্ট করেছেন যে, বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ক্ষমতা তেহরানের জন্য একটি ‘লাল রেখা’। এই অনমনীয় অবস্থান দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত বহন করে এবং একটি চুক্তির সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তোলে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ শাসন পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে, যা তাদের জন্য একটি ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানে যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব নির্ভর করবে আক্রমণের ধরণ, মাত্রা এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সীমিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পক্ষে, যার মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্ব, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সামরিক ঘাঁটি, বাসিজ ইউনিট এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর জন্য দায়ী থানাগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে, সামরিক উপায়ে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিকভাবে বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এটি বর্তমান শাসকদের ক্ষমতাকে আরও সংহত করতে পারে, আইআরজিসির পূর্ণ ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করতে পারে, অথবা ইরানকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, গত বছরের জুনের মতো একটি আক্রমণের পরিস্থিতিতে ইরানের জনগণ জাতীয় পতাকার নিচে সমবেত হতে পারে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে: প্রথমত, ইরানি জনগণ সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রের পতনের মতো পরিস্থিতিকে ভয় পায়। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য মধ্যপন্থী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। তৃতীয়ত, ইরানে বিদ্যমান শক্তিশালী আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সংহতি, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী এবং আইআরজিসি সুসংগঠিত।
মার্কিন হামলার ফলে ইরানে শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকার সংকট নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও গভীর করবে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। আইআরজিসির হাতে পূর্ণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে ইরান সামরিক বাহিনী-নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানকে ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য সেদেশে গৃহযুদ্ধের উসকানি দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা ইরানের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মুজাহিদিন-ই খালক (এমইকে), পার্টি অব ফ্রি লাইফ অব কুর্দিস্তান (পিজেএকে), আল-আহওয়াজিয়া এবং জাইশ আল-আদল (জুন্দাল্লাহ)-এর মতো গোষ্ঠীগুলো, যারা নিজ নিজ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং সরকার পরিবর্তনের ট্র্যাক রেকর্ডের মুখে তেহরান একটি ‘পাগলাটে কৌশল’ গ্রহণ করেছে, যেখানে সমঝোতা এবং সংঘাতের সংকেত একই সাথে দেওয়া হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানে হামলা ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ ডেকে আনবে। একই সাথে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মুক্ত মনোভাবও প্রকাশ করছে।
তবে, ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, হামলা হলে তারা প্রতিশোধ নেবে। এর মধ্যে রয়েছে এই অঞ্চলে তাদের মিত্র শক্তির মাধ্যমে ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা, যা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেখা দেবে, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মূলধন পাচার হতে পারে এবং ইউরোপে শরণার্থী ও অভিবাসীদের প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে।
ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে আক্রমণ করে, তবে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম ও বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা অভিবাসন সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন হামলা কেবল ইরানের জন্যই নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক গভীর ঝুঁকি তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, একবার সংঘাত শুরু হলে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অপ্রত্যাশিত উপায়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
রিপোর্টারের নাম 

























