ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটযুদ্ধের দামামা: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার দ্বৈরথ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৭:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। দেশের জনগণ ব্যালট বাক্সে নিজেদের রায় প্রদানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রচার-প্রচারণার পর চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রাক্কালে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চূড়ান্ত বার্তা নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হচ্ছে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এই মরণপণ লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। একইসাথে, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের ম্যান্ডেট আদায়ের লক্ষ্যে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রধান দলগুলো দৃশ্যত অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার ২০ দিন ধরে দেশের আনাচে-কানাচে চষে বেড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে থাকা দুই প্রধান নেতা। এই প্রচারণার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশে এখনো এককেন্দ্রিক নেতৃত্বই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রধান দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের বাইরে, তাদের দলের অন্যান্য নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ক্লান্তিহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন দুই প্রধান নেতা। দিন-রাত এক করে প্রতিটি জনপদে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন তুলে ধরার পাশাপাশি, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন। কখনো তেজস্বী ভাষায়, আবার কখনো নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। তাদের এই প্রচারণায় ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভার্চুয়াল জগতেও সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে এক লাগামহীন যুদ্ধ চলেছে। দুই শীর্ষ নেতার সমাবেশগুলোতে উপচেপড়া ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়, যা জনজোয়ারের এক অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা দুঃখজনকভাবে প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই, ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী দুই প্রধান দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। ক্ষমতায় গেলে কোন নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ইশতেহারে। ভোটারদের মন জয় করার লক্ষ্যে প্রদত্ত এই প্রতিশ্রুতিগুলো শুনে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন স্বর্গবাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, যদি তারা তাদের প্রদত্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশ একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং নাগরিকরা সুখ-সমৃদ্ধির সাগরে ভাসবে – এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়। নাগরিকদের কোনো অপ্রাপ্তি থাকবে না – এমন এক স্বপ্নময় ভবিষ্যতের হাতছানি। বিনামূল্যে চিকিৎসা, কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা, মাসোহারা, সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার লাঘব, স্কুলগামী শিশুদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’, ঘুষ বা অন্যায্য প্রক্রিয়ার বাইরে চাকরি – এমন সব প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মনে আশা জাগিয়েছে। এই স্বর্গীয় জীবনের জন্য আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা।

এবারের ইশতেহার ঘোষণার একটি বিশেষ দিক হলো, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে উপেক্ষিত ভোটারদের মন জয় করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাণপণ চেষ্টা। বিশেষত, জাতীয় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা অতীতের ইশতেহারগুলোতে ততটা গুরুত্ব পায়নি। নতুন বাংলাদেশের উপযোগী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণের আগ্রহ দেখে এবার ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকদের বিপুল উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

অতীতে বিশিষ্ট নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে এতটা আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াতকে বিশেষ শ্রম ও ঘাম ঝরাতে হয়েছে এবং তাদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে। উভয় দলই তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়েছে।

জামায়াত জোট বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ঘোষিত ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই তিনটি বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কোনো পরিকল্পনা সফল করা সম্ভব হবে না।

বিএনপির ইশতেহার জোর দিয়ে বলেছে যে, তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকার। লুটপাটের পরিবর্তে উৎপাদন, বৈষম্যহীনতা ও ন্যায্যতার নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।

ইশতেহার অনুযায়ী, বিএনপি জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে – ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের উপস্থাপিত রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফা ও জাতীয় সনদের বিষয়গুলো সমন্বয় করার প্রয়াস দেখিয়েছে। ইশতেহারে ৯টি বিষয়কে ‘প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলটির প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান; দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা; ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালু এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।

অন্যদিকে, জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রধান অস্ত্র হলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও নারী ইস্যু। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই জামায়াত তাদের ইশতেহার প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেছে। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুশাসন, রাষ্ট্রসংস্কার এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখার অঙ্গীকার করেছে দলটি। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন।

জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহারে’ অ্যাপভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত ২৬টি অগ্রাধিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো – স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

জামায়াত সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত এবং কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নয়, বরং সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; বিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক বা রেলপথের দূরত্ব দু-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভোটারদের।

বিএনপি জাতীয় সনদে যেসব সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে, সেগুলোই তারা ইশতেহারে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যেসব বিষয়ে তাদের দ্বিমত ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে তারা বিরত থেকেছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তাদের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছে ইশতেহারে। অর্থাৎ, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভোটের ভিত্তিতে নয়, আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এতে করে ইসলামী আন্দোলনসহ যেসব ছোট দল পৃথক মার্কায় নির্বাচন করে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করছিল, তা ফিকে হয়ে যাবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা: ইশতেহারের পর্যালোচনা

এবার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে প্রধান দুই দলের ইশতেহারে কী বলা হয়েছে, সেদিকে নজর দেওয়া যাক। বিএনপি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিভিন্ন সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোনো সংস্থা থেকে পত্রিকায় ফোন করা হয়নি, যা গত ১৬-১৭ বছর ধরে দেখা গেছে। দলের ইশতেহারে গণমাধ্যম বিষয়ক উপ-শিরোনামে বলা হয়েছে – সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা প্রদান এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের আগ্রাসন প্রতিরোধ করা হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হবে। সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা এবং সুরক্ষায় বিশেষ সেল গঠন করা হবে। গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হবে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করা হবে।

মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ইস্যুতে বিএনপির অঙ্গীকারে সাংবাদিক হত্যা নির্যাতনের বিচার ও সুরক্ষা সেলের প্রতিশ্রুতি সাংবাদিকদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করতে পারে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষার প্রতিশ্রুতি কেন দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। আওয়ামী শাসনামলে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রণীত এই কালো আইনটি সাংবাদিক সমাজের আন্দোলনের মুখে লীগ সরকারই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী পুনর্নিরীক্ষা করবে, তা স্পষ্ট নয়। এটি কি অজ্ঞতাবশত অঙ্গীকার? ওই আইনে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে, অথচ মামলা বাতিলের অঙ্গীকার করা হয়েছে ইশতেহারে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতিতেও বিভ্রাট রয়েছে। কারণ, সাংবাদিকদের কল্যাণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট ২০১৪ সাল থেকেই কাজ করছে। ওই ট্রাস্টের উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসরকালীন সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদনের জন্য গত সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে অংশীজনদের নিয়ে সভাও হয়েছে। এই নীতিমালা অনুমোদন করলেই সাংবাদিকদের অবসর সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। একটু খোঁজখবর করে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয় স্থান পেত না।

জামায়াতের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অঙ্গীকারেও ভুল-ভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম ভাগের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘তথ্য ও গণমাধ্যম’ শিরোনামে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ভিশন হিসেবে উল্লেখ করেছে – ‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা’। তাদের এ-সংক্রান্ত ৯ দফা অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে – গণমাধ্যমে সুস্থ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে; সংবিধান এবং মানবাধিকারের আলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সরকারের আমলে গণমাধ্যমে যেসব ফ্যাসিবাদী দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণ পর্যালোচনা করা হবে; অতীতে বন্ধ হওয়া পত্রিকা, টিভি, নিউজ পোর্টাল আবার চালুর সুযোগ দেওয়া হবে এবং অবৈধভাবে ডিক্লারেশন বাতিলের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাসসকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে; বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।

জামায়াতের অঙ্গীকারে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডও হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন করা হবে; ডিএফপির (চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর) বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা হবে – গণমাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে, প্রেস কাউন্সিলের বিচারিক ক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং গুজব, অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা হবে।

জামায়াত ফ্যাসিবাদী শাসনে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা বিভ্রান্তিকর। কারণ, বন্ধ করা সব গণমাধ্যমই চালুর ব্যবস্থা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই হয়েছে এবং অধিকাংশ চালুও হয়েছে। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিগন্ত টেলিভিশন সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চব্বিশের আগস্ট মাসের মধ্যে তুলে নেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত চালু করতে পারেনি। ফলে নতুন করে চালুর সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার অজ্ঞতাপ্রসূত বলে মনে হয়। তবে বন্ধ করে দেওয়া গণমাধ্যমের বিষয়ে পর্যালোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে তা প্রশংসিত হতো। বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর নাহিদ ইসলাম তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে এটি বন্ধ করা হয়েছে। জামায়াতের অঙ্গীকারে ডিএফপির বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ডিএফপি এখন কোনো বিজ্ঞাপন বিতরণ করে না। ডিএফপির কাছ থেকে অনেক আগেই এটি সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থায় চলে গেছে। ইশতেহারে ‘ডিএফপি’ লিখে ব্র্যাকেটে লেখা হয়েছে ‘তথ্য অধিদপ্তর’। ডিএফপির পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর’।

পেশাদার সাংবাদিক ও বিজ্ঞ সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন সব হাস্যকর ভুলভ্রান্তি হওয়ার কথা নয়। দুটি দলই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে বিএনপির তুলনায় জামায়াতের অঙ্গীকারের পরিধি ব্যাপৃত ও সুনির্দিষ্ট। ওয়েজবোর্ড, পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন, সুরক্ষার বিষয়ে জামায়াতের প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক। দুদলই স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার শর্তজুড়ে দেওয়ায় কখনো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিলে তাকে ‘দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা’র বিরুদ্ধে বলে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত ইশতেহারের ভুল-ভাল দেখে পুরো ইশতেহারের নির্ভুলতা নিয়েও সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। তবে নতুন বাংলাদেশের উপযোগী অঙ্গীকারনামা যাতে নির্বাচন-পূর্ব ভোটারের মন ভোলানোর কৌশলে পর্যবসিত না হয়, সেই প্রত্যাশা রইল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বগুড়ায় নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি: ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

ভোটযুদ্ধের দামামা: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার দ্বৈরথ

আপডেট সময় : ০৯:২৭:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। দেশের জনগণ ব্যালট বাক্সে নিজেদের রায় প্রদানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রচার-প্রচারণার পর চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রাক্কালে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চূড়ান্ত বার্তা নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হচ্ছে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এই মরণপণ লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। একইসাথে, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের ম্যান্ডেট আদায়ের লক্ষ্যে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রধান দলগুলো দৃশ্যত অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার ২০ দিন ধরে দেশের আনাচে-কানাচে চষে বেড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে থাকা দুই প্রধান নেতা। এই প্রচারণার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশে এখনো এককেন্দ্রিক নেতৃত্বই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রধান দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের বাইরে, তাদের দলের অন্যান্য নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ক্লান্তিহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন দুই প্রধান নেতা। দিন-রাত এক করে প্রতিটি জনপদে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন তুলে ধরার পাশাপাশি, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন। কখনো তেজস্বী ভাষায়, আবার কখনো নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। তাদের এই প্রচারণায় ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভার্চুয়াল জগতেও সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে এক লাগামহীন যুদ্ধ চলেছে। দুই শীর্ষ নেতার সমাবেশগুলোতে উপচেপড়া ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়, যা জনজোয়ারের এক অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা দুঃখজনকভাবে প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই, ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী দুই প্রধান দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। ক্ষমতায় গেলে কোন নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ইশতেহারে। ভোটারদের মন জয় করার লক্ষ্যে প্রদত্ত এই প্রতিশ্রুতিগুলো শুনে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন স্বর্গবাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, যদি তারা তাদের প্রদত্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশ একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং নাগরিকরা সুখ-সমৃদ্ধির সাগরে ভাসবে – এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়। নাগরিকদের কোনো অপ্রাপ্তি থাকবে না – এমন এক স্বপ্নময় ভবিষ্যতের হাতছানি। বিনামূল্যে চিকিৎসা, কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা, মাসোহারা, সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার লাঘব, স্কুলগামী শিশুদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’, ঘুষ বা অন্যায্য প্রক্রিয়ার বাইরে চাকরি – এমন সব প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মনে আশা জাগিয়েছে। এই স্বর্গীয় জীবনের জন্য আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা।

এবারের ইশতেহার ঘোষণার একটি বিশেষ দিক হলো, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে উপেক্ষিত ভোটারদের মন জয় করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাণপণ চেষ্টা। বিশেষত, জাতীয় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা অতীতের ইশতেহারগুলোতে ততটা গুরুত্ব পায়নি। নতুন বাংলাদেশের উপযোগী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণের আগ্রহ দেখে এবার ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকদের বিপুল উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

অতীতে বিশিষ্ট নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে এতটা আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াতকে বিশেষ শ্রম ও ঘাম ঝরাতে হয়েছে এবং তাদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে। উভয় দলই তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়েছে।

জামায়াত জোট বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ঘোষিত ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই তিনটি বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কোনো পরিকল্পনা সফল করা সম্ভব হবে না।

বিএনপির ইশতেহার জোর দিয়ে বলেছে যে, তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকার। লুটপাটের পরিবর্তে উৎপাদন, বৈষম্যহীনতা ও ন্যায্যতার নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।

ইশতেহার অনুযায়ী, বিএনপি জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে – ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের উপস্থাপিত রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফা ও জাতীয় সনদের বিষয়গুলো সমন্বয় করার প্রয়াস দেখিয়েছে। ইশতেহারে ৯টি বিষয়কে ‘প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলটির প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান; দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা; ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালু এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।

অন্যদিকে, জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রধান অস্ত্র হলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও নারী ইস্যু। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই জামায়াত তাদের ইশতেহার প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেছে। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুশাসন, রাষ্ট্রসংস্কার এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখার অঙ্গীকার করেছে দলটি। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন।

জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহারে’ অ্যাপভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত ২৬টি অগ্রাধিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো – স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

জামায়াত সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত এবং কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নয়, বরং সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; বিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক বা রেলপথের দূরত্ব দু-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভোটারদের।

বিএনপি জাতীয় সনদে যেসব সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে, সেগুলোই তারা ইশতেহারে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যেসব বিষয়ে তাদের দ্বিমত ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে তারা বিরত থেকেছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তাদের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছে ইশতেহারে। অর্থাৎ, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভোটের ভিত্তিতে নয়, আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এতে করে ইসলামী আন্দোলনসহ যেসব ছোট দল পৃথক মার্কায় নির্বাচন করে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করছিল, তা ফিকে হয়ে যাবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা: ইশতেহারের পর্যালোচনা

এবার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে প্রধান দুই দলের ইশতেহারে কী বলা হয়েছে, সেদিকে নজর দেওয়া যাক। বিএনপি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিভিন্ন সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোনো সংস্থা থেকে পত্রিকায় ফোন করা হয়নি, যা গত ১৬-১৭ বছর ধরে দেখা গেছে। দলের ইশতেহারে গণমাধ্যম বিষয়ক উপ-শিরোনামে বলা হয়েছে – সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা প্রদান এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের আগ্রাসন প্রতিরোধ করা হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হবে। সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা এবং সুরক্ষায় বিশেষ সেল গঠন করা হবে। গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হবে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করা হবে।

মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ইস্যুতে বিএনপির অঙ্গীকারে সাংবাদিক হত্যা নির্যাতনের বিচার ও সুরক্ষা সেলের প্রতিশ্রুতি সাংবাদিকদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করতে পারে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্নিরীক্ষার প্রতিশ্রুতি কেন দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। আওয়ামী শাসনামলে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রণীত এই কালো আইনটি সাংবাদিক সমাজের আন্দোলনের মুখে লীগ সরকারই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী পুনর্নিরীক্ষা করবে, তা স্পষ্ট নয়। এটি কি অজ্ঞতাবশত অঙ্গীকার? ওই আইনে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে, অথচ মামলা বাতিলের অঙ্গীকার করা হয়েছে ইশতেহারে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতিতেও বিভ্রাট রয়েছে। কারণ, সাংবাদিকদের কল্যাণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট ২০১৪ সাল থেকেই কাজ করছে। ওই ট্রাস্টের উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসরকালীন সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদনের জন্য গত সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে অংশীজনদের নিয়ে সভাও হয়েছে। এই নীতিমালা অনুমোদন করলেই সাংবাদিকদের অবসর সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। একটু খোঁজখবর করে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয় স্থান পেত না।

জামায়াতের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অঙ্গীকারেও ভুল-ভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম ভাগের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘তথ্য ও গণমাধ্যম’ শিরোনামে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ভিশন হিসেবে উল্লেখ করেছে – ‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা’। তাদের এ-সংক্রান্ত ৯ দফা অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে – গণমাধ্যমে সুস্থ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে; সংবিধান এবং মানবাধিকারের আলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সরকারের আমলে গণমাধ্যমে যেসব ফ্যাসিবাদী দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণ পর্যালোচনা করা হবে; অতীতে বন্ধ হওয়া পত্রিকা, টিভি, নিউজ পোর্টাল আবার চালুর সুযোগ দেওয়া হবে এবং অবৈধভাবে ডিক্লারেশন বাতিলের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাসসকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে; বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।

জামায়াতের অঙ্গীকারে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডও হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন করা হবে; ডিএফপির (চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর) বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা হবে – গণমাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে, প্রেস কাউন্সিলের বিচারিক ক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং গুজব, অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা হবে।

জামায়াত ফ্যাসিবাদী শাসনে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা বিভ্রান্তিকর। কারণ, বন্ধ করা সব গণমাধ্যমই চালুর ব্যবস্থা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই হয়েছে এবং অধিকাংশ চালুও হয়েছে। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিগন্ত টেলিভিশন সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চব্বিশের আগস্ট মাসের মধ্যে তুলে নেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত চালু করতে পারেনি। ফলে নতুন করে চালুর সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার অজ্ঞতাপ্রসূত বলে মনে হয়। তবে বন্ধ করে দেওয়া গণমাধ্যমের বিষয়ে পর্যালোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে তা প্রশংসিত হতো। বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর নাহিদ ইসলাম তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে এটি বন্ধ করা হয়েছে। জামায়াতের অঙ্গীকারে ডিএফপির বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ডিএফপি এখন কোনো বিজ্ঞাপন বিতরণ করে না। ডিএফপির কাছ থেকে অনেক আগেই এটি সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থায় চলে গেছে। ইশতেহারে ‘ডিএফপি’ লিখে ব্র্যাকেটে লেখা হয়েছে ‘তথ্য অধিদপ্তর’। ডিএফপির পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর’।

পেশাদার সাংবাদিক ও বিজ্ঞ সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন সব হাস্যকর ভুলভ্রান্তি হওয়ার কথা নয়। দুটি দলই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে বিএনপির তুলনায় জামায়াতের অঙ্গীকারের পরিধি ব্যাপৃত ও সুনির্দিষ্ট। ওয়েজবোর্ড, পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন, সুরক্ষার বিষয়ে জামায়াতের প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক। দুদলই স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার শর্তজুড়ে দেওয়ায় কখনো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিলে তাকে ‘দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা’র বিরুদ্ধে বলে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত ইশতেহারের ভুল-ভাল দেখে পুরো ইশতেহারের নির্ভুলতা নিয়েও সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। তবে নতুন বাংলাদেশের উপযোগী অঙ্গীকারনামা যাতে নির্বাচন-পূর্ব ভোটারের মন ভোলানোর কৌশলে পর্যবসিত না হয়, সেই প্রত্যাশা রইল।