সভ্যতার ইতিহাসে মাঝেমধ্যে এমন কিছু নথিপত্র সামনে আসে, যা পুরো বিশ্ববিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ‘এপস্টিন ফাইল’ ঠিক তেমনই এক প্রামাণ্য দলিল, যেখানে আধুনিক বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষমতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চরম বিপর্যয় ফুটে উঠেছে। এই ফাইলগুলো কেবল একজন অপরাধীর ব্যক্তিগত বিবরণ নয়, বরং এটি বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে, যেখানে রাজনীতি ও অর্থবিত্তের দাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে চরমভাবে।
এপস্টিন ফাইল কোনো ভিত্তিহীন গুজব বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; এটি আদালত, আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা এবং সরকারি নথির ভিত্তিতে সংকলিত একটি বাস্তব চিত্র। এই নথিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির শীর্ষ ব্যক্তিরা এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, যার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ বারবার উঠেছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, কেবল সম্পর্ক বজায় রাখাই নয়, বরং প্রভাবশালীদের অনেকেই তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অংশীদার ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—কীভাবে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও শিশু ও কিশোরীদের আর্তনাদ আড়ালে রয়ে গেল এবং ক্ষমতাধরেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলেন?
প্রকাশিত নথিতে যেসব নাম উঠে এসেছে, তারা বিশ্বমঞ্চে পরিচিত মুখ। তাদের কেউ রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক, কেউবা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা। জনসম্মুখে যারা নৈতিকতার সবক দেন এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের এই অন্ধকার অধ্যায়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এপস্টিন ফাইল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতা কীভাবে অপরাধকে আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন অপরাধীর সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকে, তখন তদন্ত প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে, সাক্ষ্য-প্রমাণ গায়েব হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা বিচারের আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই জবাবদিহি যে কতটা ভঙ্গুর, তার এক নগ্ন চিত্র হলো এই ফাইল। সাধারণ মানুষের জন্য আইনের প্রয়োগ কঠোর হলেও, ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে সেই আইন প্রায়ই গতি হারায়। বিমানযাত্রার লগবুক, ব্যক্তিগত ইমেইল এবং ডায়েরির পাতায় পাতায় যে নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে এই অপরাধের সীমানা কোনো নির্দিষ্ট দেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্ষমতা এখানে আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে, অপরাধও হয়েছে আন্তঃসীমান্ত; কিন্তু বিচারের বাণী এখানে নিভৃতে কাঁদছে।
ফাইলগুলো প্রকাশের পর জনমনে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে তালিকায় থাকা নামগুলো নিয়ে। কে কার সঙ্গে বিমানে ভ্রমণ করেছেন কিংবা কার দ্বীপে কার যাতায়াত ছিল—এই আলোচনার ভিড়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বনেতাদের নামের ওজন যত বাড়ছে, নির্যাতিতদের কণ্ঠস্বর ততটাই ক্ষীণ হয়ে আসছে। সংবাদের শিরোনামে প্রভাবশালীদের নাম প্রাধান্য পেলেও, ভুক্তভোগীদের মানসিক ট্রমা এবং তাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্পগুলো রয়ে যাচ্ছে অন্তরালে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় তথ্যপ্রমাণ সামনে আসার পরও বাস্তব পরিবর্তনের কোনো জোরালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে দায়সারা বিবৃতি বা আইনি মারপ্যাঁচে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি কেবল একটি আইনি সংকট নয়, বরং একটি মানবিক বিপর্যয়। অথচ প্রভাবশালী মহলে ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনের চেয়ে নিজেদের সুনাম রক্ষার চিন্তাই যেন বেশি প্রকট।
এপস্টিন ফাইল বিশ্বব্যবস্থার এক চরম ‘দ্বিচারিতা’ উন্মোচন করেছে। একদিকে যখন বিশ্বমঞ্চে মানবাধিকার ও নৈতিকতার বুলি আওড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে সেই অধিকারগুলোই পদদলিত করা হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সত্যকে কখনোই চিরতরে চেপে রাখা যায় না। এপস্টিন ফাইল আজ সেই অবদমিত সত্যের প্রতিধ্বনি করছে। এটি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা যদি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যায়, তবে অপরাধ সেখানে অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যদি তার দুর্বল নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্র তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। এখন দেখার বিষয়, এই উন্মোচিত সত্য কি সত্যিই কোনো পরিবর্তন আনবে, নাকি ক্ষমতার দাপটে আবারো সবকিছু অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে। অপরাধী যেমন দোষী, সব জেনেও যারা নীরব থেকেছেন, সভ্যতার বিচারে তারাও সমানভাবে দায়ী।
রিপোর্টারের নাম 

























