বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে দীর্ঘদিনের সম্ভাবনা ও অগ্রগতির সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভরতা, মসলিনের ঐতিহ্য এবং নৌবন্দর সুবিধার কারণে একসময় এই ব-দ্বীপ অঞ্চল বিদেশি বণিকদের আকৃষ্ট করলেও, ঔপনিবেশিক শাসনের পর্যায়ক্রমিক প্রভাব আজ আমাদের তৃতীয় বিশ্বের পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে অফুরন্ত সম্ভাবনা সত্ত্বেও, কেবল সমস্যা ও সংকটের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজানো হলে টেকসই উন্নতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বরং আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনার আলোকে কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।
জনসংখ্যাকে একসময় বোঝা হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমানে এটিই আমাদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাকশিল্প থেকে অর্জিত রপ্তানি আয় এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্যবিদায়ী বছরে প্রবাসীরা প্রায় ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক। একইভাবে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই দুটি খাতই মূলত বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যার ওপর নির্ভরশীল।
তবে কেবল ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখলেই হবে না; টেকসই উন্নয়ন ও গুণগত মানোন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত সমস্যা ও সংকটগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। পূর্ববর্তী সময়ে কেবল জিডিপি বৃদ্ধির ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্বারোপ মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মান উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি। অপরিকল্পিতভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সততা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল সংকটগুলোর মূলে রয়েছে দুর্নীতি। প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি এক নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা দিচ্ছে। ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। এই অর্থপাচারের সঙ্গে কেবল রাজনৈতিক নেতারাই নন, আমলাদেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাগ্রে দুর্নীতিকে বিদায় জানানো জরুরি।
খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংক খাতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে, যার একটি কারণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে জামানত ছাড়াই বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হচ্ছে এবং একজন সম্ভাব্য খেলাপিকেই আরও বেশি ঋণ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ব্যাংকিং নীতিমালায় কার্যকর পরিবর্তন এনে এই সংকট মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
বৈদেশিক ঋণও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি মৌলিক সংকট। অপরিকল্পিত ঋণ গ্রহণের ফলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বর্তমানে ৪৮৩ মার্কিন ডলার। অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘাটতি বাজেট মেটাতে বারবার ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বাংলাদেশ সরকার ঋণ নিচ্ছে, যার পরিমাণ বর্তমানে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ঋণের শর্ত পূরণে কৃষি উৎপাদনের কাঁচামাল ও জ্বালানি খাতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, যার ফলে শিল্প উৎপাদনে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মন্দার অন্যতম কারণ ছিল অপরিকল্পিত বিদেশি ঋণ গ্রহণ, যা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
বেকারত্ব দেশের অন্যতম মৌলিক সংকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞার দুর্বলতার কারণে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা কম মনে হলেও, দেশে ছদ্ম বেকারের সংখ্যা কোটিরও বেশি। শিক্ষা কারিকুলাম ও পেশাগত কাঠামোর মধ্যে বিস্তর ফারাক, কারিগরি দক্ষতার অভাব, এবং সরকারি চাকরির প্রতি মোহ বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পথে পুঁজি সংগ্রহ ও অনিরাপত্তার মতো বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, যেখানে মোট আমদানি মোট রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৯ সালের পর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা রপ্তানি খাতে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কারণ হতে পারে। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, নতুন এফটিএ ও পিটিএ চুক্তি স্থাপন এবং আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আমদানি বিকল্প শিল্পের দিকে মনোযোগী হতে হবে। ওষুধশিল্প ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগানো উচিত।
কর-জিডিপি হারে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নিচে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অনুপাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কমপক্ষে ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। রাজস্ব আহরণে এই ঘাটতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে, কর সংগ্রহে দক্ষতা বাড়াতে এবং অটোমেশন ও জটিলতা নিরসন নিশ্চিত করতে হবে।
আয়বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতির কবলে সাধারণ জনগণের জীবনমানের অবনতি ঘটছে। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে না পারলে, তা কেবল একটি ‘পটেনশিয়াল ইকোনমিক টাইগার’ হয়েই থাকবে। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে এর দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
একটি ভঙ্গুর ও আস্থাহীন অর্থনীতির সমাধানকল্পে অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হলেও, এর ইতিবাচক প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়। কেবল কয়েকটি নির্দেশকে সংখ্যাগত উন্নতি হলেই দেশের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিগত সময়ে মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও, জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন না হওয়ার মূল কারণ ছিল অর্থনীতিতে ইনসাফ বা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা না হওয়া।
অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও শক্তিমত্তার পাশাপাশি ন্যায্যতা তথা ইনসাফকে অন্তর্নিহিত রাখতে হবে। শাসনতান্ত্রিক যেকোনো সিদ্ধান্ত ও কার্যপরিচালনার জন্য সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে টেন্ডার বাণিজ্যের মূলোৎপাটন করতে হবে। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা এমন একটি বাজেট চাই, যা হবে বাস্তবায়নযোগ্য, দক্ষ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ফলপ্রসূ।
দেশের সামগ্রিক চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে এবং সম্পদ যেন ক্ষুদ্রসংখ্যক পুঁজিপতির কাছে কুক্ষিগত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব-দ্বীপীয় ভূমির সুবিধা, জনমিতিক লভ্যাংশ, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জনগণের দেশপ্রেম—এই সবকিছু নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি প্রতিটি নীতি ও কাজে ইনসাফ ও সততার বীজ বুনতে পারা যায়, তবেই আগামীর বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বের পথ ধরতে সক্ষম হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























