ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশ্ন: দিল্লিতে নিজেদের আয়নায় কী দেখছে?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৭:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত, দেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ঘটনাক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম এনসিপির শীর্ষ নেতাকে প্রশ্ন করেছে, ‘এনসিপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ কি ধর্মরাষ্ট্রে পরিণত হবে?’ একইভাবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারের প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বারবার জানতে চাইছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা হারাল কিনা। এমনকি, ভারতের রাজ্যসভার একজন সদস্য আসন্ন নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট জোটের জয়লাভকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিপন্থী হিসেবেও মন্তব্য করেছেন। প্রায় ১৭ মাস ধরে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মধ্যে এই একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে।

তবে, এই প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে। ২০১৪ সালে বিপুল ভোটে জিতে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের স্বশাসন বাতিল করে এটিকে সরাসরি দিল্লির শাসনের অধীনে আনা হয়েছে এবং সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। উত্তর প্রদেশে শিবসেনার নেতা আদিত্য যোগীর নির্দেশে মুসলিম নাগরিকদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা বা ট্রাকে করে গরু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার মতো বহু ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বোরকা পরা মুসলিম নারীকে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ানোর অভিযোগও উঠেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে।

মুসলিম নিধন ও নির্যাতনের অভিযোগ আড়াল করতে ‘কাশ্মীর ফাইলস’, ‘কেরালা ফাইলস’ ও ‘কলকাতা ফাইলস’-এর মতো প্রচারণাভিত্তিক চলচ্চিত্র মুক্তি দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষের আগুন আরও উসকে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের মোগল শাসনের গল্পকে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে মুসলিমবিদ্বেষী চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়েছে, যা মোগল শাসকদের সমাধি ভাঙতে হিন্দু জনতাকে প্ররোচিত করার অভিযোগ ওঠে। বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণের ঘটনা ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ পরিচয়ের ওপর বড় আঘাত হেনেছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। প্রায়শই প্রাচীন মসজিদের নিচে মন্দিরের অস্তিত্বের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখে তা ভেঙে ফেলার জন্য শিবসেনা ও বজরং দলের সদস্যরা তৎপর হয়ে ওঠে। প্রাচীন মাজার ভাঙার ক্ষেত্রেও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়েছে। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক অঙ্গনের কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাদের ‘পাকিস্তানের তোতা’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

ভারতের গণমাধ্যমগুলোও এই হিন্দুত্ববাদী জিঘাংসার মূল সুর হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ। সাংবাদিকরা হিন্দুভারত উদয়ের আনন্দে কপালে লম্বা লাল তিলক এঁকে একপেশে সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। ফেক নিউজ ও প্রোপাগান্ডার প্রচারণায় একেকজন তারকা সাংবাদিক হয়ে উঠেছেন। যখন প্রধানমন্ত্রী মোদি সাধুদের প্রণাম করেন, তখন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বিদ্বেষের উন্মত্ততা ছড়িয়ে অপসাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, ভারতের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম যখন নিজেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে এবং এর প্রতিফলন তাদের কার্যকলাপে স্পষ্ট, তখন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা হারানোর আশঙ্কা নিয়ে তারা কেন এত চিন্তিত? যখন তারা নিজেরাই তথাকথিত ‘ধর্মরাষ্ট্রের’ উপাদানে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ‘ধর্মরাষ্ট্র’ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভারতীয় গণমাধ্যমের ঘুম আসছে না কেন? এটি শতছিদ্র ঝাঝর কর্তৃক সুচের পেছনের ছিদ্র খোঁজার মতোই এক ধরনের দ্বিমুখী নীতি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

কিছু বিশ্লেষক এই প্রবণতাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে সৃষ্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কিছু মানুষ রাতারাতি জমিদারি লাভ করেছিল, যা স্বাধীনতার পর তারা হারিয়ে ফেলে। এই হারানো ‘জমিদারি’ বা প্রভাব ফিরে পাওয়ার এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা হতে পারে। তারা আরও মনে করেন, বাংলাদেশের কিছু অংশের মধ্যে এখনো এই ধারণা প্রচলিত আছে যে, পূজার আরতি দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, কিন্তু নামাজ পড়া ‘মুছুম্মানি’ বা সাম্প্রদায়িক। এই ধরনের ধারণার ওপর ভর করে ভারত তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুলতানি, মোগল ও নবাবি আমলে পূর্ববঙ্গে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হিন্দু জমিদার এবং বর্ণবাদী কর্মকর্তাদের নিগ্রহ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা-ই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ব্যাকরণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের উচিত তার শেকড়ে ফিরে যাওয়া এবং হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তোলা। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং গণমাধ্যমের সাম্প্রদায়িক উসকানি থেকে বাংলাদেশকে দূরে থাকতে হবে। জার্মানির খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী দল প্রমাণ করেছে, কীভাবে সামাজিক গণতন্ত্র, কল্যাণরাষ্ট্র ও সাম্যচিন্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া যায়। প্রত্যেকটি নাগরিকের মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করতে না পারলে সংবিধান, রাজনীতি এবং প্রতিদিনের দলীয় বিতর্কের কোনো অর্থ থাকে না। বাংলাদেশকে আসলে একটি মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশকে সর্বদা অতন্দ্র থাকতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীতে শিশু হত্যার নির্মমতা: ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার জমিয়ত

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশ্ন: দিল্লিতে নিজেদের আয়নায় কী দেখছে?

আপডেট সময় : ১১:০৭:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত, দেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ঘটনাক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম এনসিপির শীর্ষ নেতাকে প্রশ্ন করেছে, ‘এনসিপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ কি ধর্মরাষ্ট্রে পরিণত হবে?’ একইভাবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারের প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বারবার জানতে চাইছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা হারাল কিনা। এমনকি, ভারতের রাজ্যসভার একজন সদস্য আসন্ন নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট জোটের জয়লাভকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিপন্থী হিসেবেও মন্তব্য করেছেন। প্রায় ১৭ মাস ধরে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মধ্যে এই একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে।

তবে, এই প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে। ২০১৪ সালে বিপুল ভোটে জিতে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের স্বশাসন বাতিল করে এটিকে সরাসরি দিল্লির শাসনের অধীনে আনা হয়েছে এবং সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। উত্তর প্রদেশে শিবসেনার নেতা আদিত্য যোগীর নির্দেশে মুসলিম নাগরিকদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা বা ট্রাকে করে গরু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার মতো বহু ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বোরকা পরা মুসলিম নারীকে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ানোর অভিযোগও উঠেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে।

মুসলিম নিধন ও নির্যাতনের অভিযোগ আড়াল করতে ‘কাশ্মীর ফাইলস’, ‘কেরালা ফাইলস’ ও ‘কলকাতা ফাইলস’-এর মতো প্রচারণাভিত্তিক চলচ্চিত্র মুক্তি দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষের আগুন আরও উসকে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের মোগল শাসনের গল্পকে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে মুসলিমবিদ্বেষী চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়েছে, যা মোগল শাসকদের সমাধি ভাঙতে হিন্দু জনতাকে প্ররোচিত করার অভিযোগ ওঠে। বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণের ঘটনা ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ পরিচয়ের ওপর বড় আঘাত হেনেছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। প্রায়শই প্রাচীন মসজিদের নিচে মন্দিরের অস্তিত্বের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখে তা ভেঙে ফেলার জন্য শিবসেনা ও বজরং দলের সদস্যরা তৎপর হয়ে ওঠে। প্রাচীন মাজার ভাঙার ক্ষেত্রেও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়েছে। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক অঙ্গনের কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাদের ‘পাকিস্তানের তোতা’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

ভারতের গণমাধ্যমগুলোও এই হিন্দুত্ববাদী জিঘাংসার মূল সুর হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ। সাংবাদিকরা হিন্দুভারত উদয়ের আনন্দে কপালে লম্বা লাল তিলক এঁকে একপেশে সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। ফেক নিউজ ও প্রোপাগান্ডার প্রচারণায় একেকজন তারকা সাংবাদিক হয়ে উঠেছেন। যখন প্রধানমন্ত্রী মোদি সাধুদের প্রণাম করেন, তখন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বিদ্বেষের উন্মত্ততা ছড়িয়ে অপসাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, ভারতের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম যখন নিজেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে এবং এর প্রতিফলন তাদের কার্যকলাপে স্পষ্ট, তখন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা হারানোর আশঙ্কা নিয়ে তারা কেন এত চিন্তিত? যখন তারা নিজেরাই তথাকথিত ‘ধর্মরাষ্ট্রের’ উপাদানে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ‘ধর্মরাষ্ট্র’ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভারতীয় গণমাধ্যমের ঘুম আসছে না কেন? এটি শতছিদ্র ঝাঝর কর্তৃক সুচের পেছনের ছিদ্র খোঁজার মতোই এক ধরনের দ্বিমুখী নীতি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

কিছু বিশ্লেষক এই প্রবণতাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে সৃষ্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কিছু মানুষ রাতারাতি জমিদারি লাভ করেছিল, যা স্বাধীনতার পর তারা হারিয়ে ফেলে। এই হারানো ‘জমিদারি’ বা প্রভাব ফিরে পাওয়ার এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা হতে পারে। তারা আরও মনে করেন, বাংলাদেশের কিছু অংশের মধ্যে এখনো এই ধারণা প্রচলিত আছে যে, পূজার আরতি দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, কিন্তু নামাজ পড়া ‘মুছুম্মানি’ বা সাম্প্রদায়িক। এই ধরনের ধারণার ওপর ভর করে ভারত তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুলতানি, মোগল ও নবাবি আমলে পূর্ববঙ্গে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হিন্দু জমিদার এবং বর্ণবাদী কর্মকর্তাদের নিগ্রহ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা-ই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ব্যাকরণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের উচিত তার শেকড়ে ফিরে যাওয়া এবং হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তোলা। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং গণমাধ্যমের সাম্প্রদায়িক উসকানি থেকে বাংলাদেশকে দূরে থাকতে হবে। জার্মানির খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী দল প্রমাণ করেছে, কীভাবে সামাজিক গণতন্ত্র, কল্যাণরাষ্ট্র ও সাম্যচিন্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া যায়। প্রত্যেকটি নাগরিকের মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করতে না পারলে সংবিধান, রাজনীতি এবং প্রতিদিনের দলীয় বিতর্কের কোনো অর্থ থাকে না। বাংলাদেশকে আসলে একটি মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশকে সর্বদা অতন্দ্র থাকতে হবে।