ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংকট ও জোট সরকার: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১৬:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যখন কোনো একক রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন জোট সরকার বা জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিশ্বজুড়ে বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়, যেখানে বিভিন্ন দল একত্রিত হয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়, যা দেশের গণতন্ত্র ও সরকার গঠনে জোট রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, জাতীয় সরকার বা জোট সরকার সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতি বা সংকটের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তারাই সরকার গঠন করে। তবে, যদি কোনো দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পায়, তখন অন্য দল বা গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করা হয়। একাধিক দল যখন একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করে, তখন তাকে কোয়ালিশন সরকার বা জোট সরকার বলা হয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রায়শই দেখা যায়।

বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে এর এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। সেবার বিএনপি জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসনের চেয়ে কম ছিল। একই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি এবং জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন লাভ করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ স্পষ্ট করেন যে, তার কাছে সরকার গঠনের উপযুক্ত দল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। এমন পরিস্থিতিতে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অপরদিকে, বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর শর্তহীন সমর্থন লাভে সক্ষম হয়। যদিও জামায়াতে ইসলামী কোনো মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেনি, তবে তাদের প্রতি সৌজন্যমূলকভাবে দুটি সংরক্ষিত মহিলা আসন দেওয়া হয়। এই জোট গঠনের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী’ জনমতও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়, যখন আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয় বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। এই বিভাজনের জন্য অবশ্য কোনো একক পক্ষকে দায়ী করা যায় না, বরং উভয় পক্ষেরই কিছু ভুল-ত্রুটি ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে, ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোট পুনরায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন এবং জামায়াত ১৭টি আসন লাভ করে। এবার বিএনপিকে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য জামায়াতের দ্বারস্থ হতে হয়নি, কারণ তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করেছিল এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির শীর্ষ নেতা বি. চৌধুরীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, “একজনকে সারাদিন খাটিয়ে মজুরি না দেওয়া অনৈতিক কাজ হতো।”

২০০৬ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নেয়, যা ১/১১ নামে পরিচিত জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবরণ করতে হয় এবং তারেক রহমানকে দেশত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। এসব ঘটনা বাংলাদেশের জোট রাজনীতি ও ক্ষমতা ভাগাভাগির জটিল সমীকরণকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীতে শিশু হত্যার নির্মমতা: ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার জমিয়ত

সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংকট ও জোট সরকার: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

আপডেট সময় : ১০:১৬:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যখন কোনো একক রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন জোট সরকার বা জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিশ্বজুড়ে বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়, যেখানে বিভিন্ন দল একত্রিত হয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়, যা দেশের গণতন্ত্র ও সরকার গঠনে জোট রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, জাতীয় সরকার বা জোট সরকার সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতি বা সংকটের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তারাই সরকার গঠন করে। তবে, যদি কোনো দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পায়, তখন অন্য দল বা গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করা হয়। একাধিক দল যখন একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করে, তখন তাকে কোয়ালিশন সরকার বা জোট সরকার বলা হয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রায়শই দেখা যায়।

বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে এর এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। সেবার বিএনপি জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসনের চেয়ে কম ছিল। একই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি এবং জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন লাভ করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ স্পষ্ট করেন যে, তার কাছে সরকার গঠনের উপযুক্ত দল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। এমন পরিস্থিতিতে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অপরদিকে, বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর শর্তহীন সমর্থন লাভে সক্ষম হয়। যদিও জামায়াতে ইসলামী কোনো মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেনি, তবে তাদের প্রতি সৌজন্যমূলকভাবে দুটি সংরক্ষিত মহিলা আসন দেওয়া হয়। এই জোট গঠনের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী’ জনমতও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়, যখন আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয় বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। এই বিভাজনের জন্য অবশ্য কোনো একক পক্ষকে দায়ী করা যায় না, বরং উভয় পক্ষেরই কিছু ভুল-ত্রুটি ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে, ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোট পুনরায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন এবং জামায়াত ১৭টি আসন লাভ করে। এবার বিএনপিকে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য জামায়াতের দ্বারস্থ হতে হয়নি, কারণ তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করেছিল এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির শীর্ষ নেতা বি. চৌধুরীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, “একজনকে সারাদিন খাটিয়ে মজুরি না দেওয়া অনৈতিক কাজ হতো।”

২০০৬ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নেয়, যা ১/১১ নামে পরিচিত জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবরণ করতে হয় এবং তারেক রহমানকে দেশত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। এসব ঘটনা বাংলাদেশের জোট রাজনীতি ও ক্ষমতা ভাগাভাগির জটিল সমীকরণকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।