জুলাই ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ছাপিয়ে এক গভীর জাতীয় মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্ব ঢাকা-৮ আসনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নেমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘হাদি মডেল’ নামে এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছে। তার দেখানো পথেই এখন দেশের আগামীর রাজনীতি ও নির্বাচনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।
সংস্কৃতিই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি
শরীফ ওসমান হাদি একটি মৌলিক সত্য অনুধাবন করেছিলেন যে, সংস্কৃতিই হলো রাজনীতির চালিকাশক্তি। তিনি মনে করতেন, প্রায় দেড় দশক ধরে যে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বাংলাদেশে জেঁকে বসেছিল, তার শিকড় কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ‘সংস্কৃতি’র মধ্যে প্রোথিত ছিল। একে তিনি ‘শাহবাগ রাষ্ট্র’ বা ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ হিসেবে চিহ্নিত করতেন। হাদি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতিকে সংস্কার করা না গেলে, অর্থাৎ মানুষের চিন্তা ও রুচির আমূল পরিবর্তন না ঘটলে রাজনীতিতে কেবল ‘চেহারার বদল’ হবে, ‘ব্যবস্থার বদল’ হবে না। এ কারণেই তিনি তার আন্দোলনকে ‘পলিটিক্যাল-কালচারাল’ ইনকিলাব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তার কাছে রাজনীতি ছিল সংস্কৃতিরই একটি দৃশ্যমান রূপ। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘রাজনীতি সংস্কৃতি তৈরি করে না, বরং সংস্কৃতিই রাজনীতির কাঠামো তৈরি করে।’ তাই রাজপথের স্লোগান থেকে শুরু করে নির্বাচনী ইশতেহার সবকিছুতেই তিনি এক ধরনের নান্দনিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিতে ‘স্বচ্ছতা’ যখন কেবলই একটি আলংকারিক শব্দ, তখন হাদি একে একটি জীবন্ত অনুশীলনে পরিণত করেছিলেন। তার জীবন ছিল একটি স্বচ্ছ কাচের ঘরের মতো; তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো গোপন চোরাগলি থাকতে পারে না। এর সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ পাওয়া যায় তার সংগঠনের কাছে দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি পারিবারিক প্রয়োজনে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ থেকে আনুষ্ঠানিক ছুটি নিয়েছিলেন এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছিলেন। এটি একাধারে নেতৃত্বের স্বচ্ছতা এবং সংগঠন ও জনগণের কাছে জবাবদিহির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যা দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড় নৈতিক বার্তা।
নির্বাচনী অর্থায়নে ক্রাউড ফান্ডিং: জনগণের সেচনালা
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘কালো টাকা’ এবং ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের’ যে সংস্কৃতি ছিল, হাদি তার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সেই অলিখিত চুক্তিটি ভেঙে দিয়েছিলেন, যেখানে জয়লাভের পর পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য দুর্নীতির ও টাকা কামানোর লাইসেন্স পাওয়া যেত। হাদি শুরু করেছিলেন ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ মডেল, যা আজ দেশের নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অন্য প্রার্থীরা যখন করপোরেট নদী থেকে ক্ষমতা আর অর্থ কুক্ষিগত করার জন্য ‘বাঁধ’ নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন, হাদি তখন ব্যস্ত ছিলেন ‘সেচনালা’ খনন করতে। তিনি জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ২০ বা ৫০ টাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমর্থন সংগ্রহ করে তা সরাসরি রাজনীতির ময়দানে প্রবাহিত করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেন, রাজনীতির এই ফসলের মালিকানা যেন প্রকৃত কৃষকদেরই (জনগণের) থাকে। হাদি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যদি কোনো রাজনৈতিক দল করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্বাচনী খরচ নেয়, তবে তারা সেই প্রতিষ্ঠানের দাসে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে, সাধারণ মানুষের দেওয়া অল্প অল্প টাকা নেতাকে শুধু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে। আজ ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)-এর হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাহিদ ইসলাম কিংবা এবি পার্টির ব্যারিস্টার ফুয়াদের মতো নেতারা যে ‘পেনিল্যাস’ বা স্বল্প খরচের ক্যাম্পেইন করছেন, তার প্রেরণা মূলত হাদির সেই ‘সেচ নালা’ মডেল।
রাজনীতিবিমুখ তারুণ্যের জাগরণ
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি ‘অরাজনৈতিক’ প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা। হাদি এই রূপান্তরের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন। যে শিক্ষিত তরুণরা এতদিন রাজনীতিকে ‘নোংরা’ মনে করে পাশ কাটিয়ে চলত, হাদি তাদের সামনে প্রমাণ করেছেন, বুদ্ধিদীপ্ত আলাপ এবং নৈতিক দৃঢ়তা দিয়েও রাজনীতি জয় করা সম্ভব। হাদির ব্যক্তিত্ব ছিল জেনারেশন জেডের (জেন-জি) কাছে একাধারে একজন মেন্টর এবং একজন সহযোদ্ধার মতো। অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট তরুণ ডাক্তার তাসনিম জারা-সহ অনেক নতুন মুখ এ বছর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যা হাদির তরুণ জাগরণেরই ফল।
মাঠপর্যায়ের প্রচার কৌশল: রুট-লেভেলের ‘মুয়াজ্জিন’
রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনটি মূলত অভিজাত ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র। সেখানে হাদি যখন প্রার্থী হলেন, তখন অনেকের কাছেই তা হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু হাদি কোনো বিশাল কর্মীবাহিনীর ওপর নির্ভর না করে নিজের ‘ব্যক্তিগত সামাজিক অ্যাডভোকেসি’র ওপর ভরসা করেছিলেন। তার প্রচারণার একটি বিশেষ কৌশল ছিল ‘ফজর ক্যাম্পেইন’। ফজরের নামাজের পর শান্ত মনে মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের চাওয়া-পাওয়া ও অভিযোগ শোনা ছিল তার প্রধান কাজ। ভিভিআইপি প্রটোকল বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ভ্যান। তিনি বলতেন, ‘একজন রাজনীতিবিদের মৃত্যু হবে রাজপথে, এসি রুমে নয়।’ এই মাটির কাছাকাছি থাকার সক্ষমতাই তাকে অন্য প্রার্থীদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
মূলধারার রাজনীতিতে ‘হাদি ইফেক্ট’
হাদির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য সম্ভবত তার মৃত্যুর পর মূলধারার দলগুলোর আচরণগত পরিবর্তন। হাদি দেখিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা না বললে এবং তাদের সঙ্গে না মিশলে শুধু পদবি দিয়ে জনসমর্থন পাওয়া যায় না। আজ আমরা দেখছি, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মানুষের মধ্যে আসতে শুরু করেছেন। ব্যারিকেড বা বুলেটপ্রুফ গ্লাস সরিয়ে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছেন। গত ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারেক রহমানের সেশনটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে হাদির প্রভাব স্পষ্ট। যখন তারেক রহমান তরুণদের উদ্দেশে বলেন, তাকে ‘স্যার’ না ডেকে ‘ভাইয়া’ ডাকতে, তখন এটি মূলত হাদির সেই ‘ব্রাদার’ ইমেজেরই প্রতিফলন, যা কোটি প্রাণের কলিজায় জায়গা করে নিয়েছিল। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল তৈরির প্রতিযোগিতা বা মুক্ত আকাশের নিচে আড্ডা দেওয়ার যে প্রবণতা বড় দলগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত হাদির মানুষের কাছে যাওয়ার সেই কৌশলেরই প্রভাব।
ডিজিটাল লিটারেসি ও কিউআর কোড বিপ্লব
হাদি প্রথাগত বড় বড় বিলবোর্ডের বদলে স্বল্পমূল্যের হ্যান্ডবিল এবং তাতে কিউআর কোড ব্যবহার করেছিলেন। যে কিউআর কোডটি স্ক্যান করলেই ভোটাররা তার ফেসবুক পেজে যেতে পারতেন, যেখানে তার নির্বাচনী প্রচার ও অন্যান্য কার্যক্রম দেখতে পেতেন। তিনি টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াও সচেতনভাবে ব্যবহার করেছিলেন। এগুলোর মাধ্যমে রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষের কাছেও তার বার্তা পৌঁছে যায়। এটি ছিল বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিপণনের এক নতুন দিগন্ত।
জনতার ইশতেহার: নিচ থেকে ওপরে ওঠার ডাক
হাদি বিশ্বাস করতেন, ইশতেহার কোনো ড্রয়িংরুমে বসে ড্রাফটিং করার বিষয় নয়। এটি হতে হবে জনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি সরাসরি প্রতিটি গলির মানুষের কাছ থেকে তাদের আকাঙ্ক্ষা ও সমস্যার কথা লিখে নিতে শুরু করেছিলেন। এ ‘বটম-আপ’ অ্যাপ্রোচ আজ জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলোকেও প্রভাবিত করেছে। তাদের সাম্প্রতিক ‘জনতার ইশতেহার’ ওয়েবসাইট ও অ্যাপস মূলত হাদির সেই ধারণারই একটি প্রযুক্তিগত সংস্করণ।
ইনসাফের অমীমাংসিত মহাকাব্য
শরীফ ওসমান হাদি প্রতিদিন মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমাতেন। বাকি সময় তিনি ব্যয় করতেন মানুষের জন্য। তার এই প্রচণ্ড মানসিক শক্তি এবং লেগে থাকার প্রবণতা ছিল মূলত একটি ‘বোনাস লাইফের’ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তিনি জানতেন যেকোনো সময় ঘাতকের বুলেট তার জীবন স্তব্ধ করে দিতে পারে। তিনি এও জানতেন যে, ‘মানুষ মারা যায়, কিন্তু ধারণা মরে না’। হাদি আজ সশরীরে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে তার ছায়া অনুভূত হচ্ছে। স্বচ্ছতা, ক্রাউড ফান্ডিং, তারুণ্যের সম্পৃক্ততা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে মডেল হাদি রেখে গেছেন, তা এখন আর শুধু একটি সংগঠনের সম্পদ নয়, তা হয়ে উঠেছে একটি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিএনএ। হাদির খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি হাদির প্রবর্তিত ‘ইনসাফ’ভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নাগরিক সমাজের কর্তব্য। হাদি চলে গেছেন অসীমত্বের পানে, কিন্তু তার জ্বালিয়ে দেওয়া ইনসাফের মশাল এখন কোটি তরুণের হাতে।
রিপোর্টারের নাম 

























